Monday, October 09, 2006

মার্কসবাদের বর্তমান অবস্থা

 গত ১৭ই সেপ্টেম্বরের দেশ পত্রিকায় আগরতলার অরুন্ধতীনগর থেকে প্রদীপবিকাশ রায়ের বর্তমান পশ্চিমবঙ্গের মার্কসবাদী সরকার এবং সাধারনভাবে মার্কসবাদের উপরে একটি চিঠি প্রকাশিত হয়েছে । তাঁর এই চিঠি ব্যক্তিগত ভাবে কমিউনিস্টদের সম্পর্কে আমার মতামতের সঙ্গে মিলে যায় । নিচে তাঁর চিঠি থেকে খানিক অংশ তুলে দিলাম ।

কলকাতার প্রেস ক্লাবে ‘মিট দ্য প্রেস’ অনুষ্ঠানে সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের উত্তরে মার্কসবাদী নেতা তথা মুখ্যমন্ত্রী বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য একবার বলেছিলেন সমাজতন্ত্র কায়েম করতে পারব না । সমাজতন্ত্র হবেও না । আমি এখানে পুঁজিবাদ করছি । পুঁজিবাদকে শ্রমিক ও সাধারন মানুষের স্বার্থে কাজে লাগানোর চেষ্টা করছি ।

তাহলে বিগত কয়েক যুগ ধরে মার্কসবাদী বিপ্লবীরা যে বিপ্লব বিপ্লব খেলায় এত আস্ফালন করলেন, লক্ষ লক্ষ মানুষের রক্তপাত ঘটালেন, সমাজতন্ত্র নামক সোনার অশ্বডিম্ব দেওয়ার এত স্বপ্ন দেখালেন -- সবই ছিল প্রহসন ? সবই ছিল ধোঁকাবাজি ?

মার্কসবাদের অর্থনীতিতে মারাত্মক ত্রুটির অনিবার্য পরিণামেই আজ থেকে ১৫ বছর আগে অর্থাৎ ১৯৯১ সালে রাশিয়া সহ পূর্ব ইউরোপের রাষ্ট্রগুলিতে মার্কসবাদী শাসনের পতন হওয়ার পরেও, মার্কসবাদী তাত্ত্বিকরা সেই অলীক সমাজতন্ত্রের স্বপ্ন দেখা ছাড়েননি । মার্কসবাদের পতনের জন্য দায়ী ত্রুটিগুলি স্বীকার করে নিয়েও শুধু আত্মগ্লানি বিমোচনের জন্য ও ফোস্কা পড়া গায়ে সান্ত্বনার প্রলেপ দেওয়ার জন্য সেই সময়কার কিছু বামপন্থী তাত্ত্বিক লিখেছেন, মার্কসবাদ একটি বিজ্ঞানপ্রসূত সত্য । এ বড় হাস্যকর যুক্তি ! বরং বলা ভাল এ এক অদ্ভুত অন্ধবিশ্বাস মার্কসবাদের প্রতি ।

বুদ্ধদেব বাবুর এই ঐতিহাসিক উক্তির পরেও কি আর মার্কসবাদ একটি বিজ্ঞানপ্রসূত সত্য থাকে ? পুঁজিবাদের অবসানের জন্য যে মার্কসবাদের জন্ম, সেই মার্কসবাদের দ্বারা অনেক রক্তপাত ঘটানোর পর সেই পুঁজিবাদের পদতলেই তার পরিসমাপ্তি ঘটল ! সভ্যতার ইতিহাসে এ যে কত বড় পরাজয়, তা বোঝার মত মুক্তবুদ্ধি কি আর আছে ? তথাকথিত বাম বুদ্ধিজীবিদের মস্তিষ্ক যে অসাড় হয়ে গিয়েছিল, ভ্রান্ত পথে ছুটে তাঁরা যে আত্মঘাতী আস্ফালনে উন্মত্ত হয়ে উঠিছিলেন, তাঁরা যে মার্কসবাদ নামে এক মারাত্মক মায়াহরিণের পিছনে ছুটে আজ এই নৈতিক অপমৃত্যুর মুখে এসে দাঁড়িয়েছেন, তা বোঝার মতো নৈতিক চেতনা কি তাঁদের আছে ?

রাশিয়া ও পূর্ব ইউরোপের কমিউনিস্ট দেশগুলির পতনের পর যাঁরা সেইসব দেশে গিয়েছেন সেই প্রত্যক্ষদর্শীদের দৃষ্টিতে যে কারণ ধরা পড়েছে তা হচ্ছে, সেইসব সমাজতান্ত্রিক দেশগুলির পতনের মূলে রয়েছে দুটি প্রধান কারণ -- প্রথম, খাদ্য ও নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যের তীব্র অভাব আর দ্বিতীয়টি ব্যক্তিস্বাধীনতা, বাকস্বাধীনতার অনধিকার ।

অনেকে প্রশ্ন করেন, পশ্চিমবঙ্গে তো কমিউনিস্ট সরকার তিরিশ বছর ধরে শাসন চালাচ্ছে, কই সেখানে তো রাশিয়ার মতো এমন দেউলিয়া হয়ে যায়নি ? তার উত্তরে বলতে হয় -- পশ্চিমবঙ্গও কবেই দেউলিয়া হয়ে গিয়ে বামফ্রন্ট সরকারের লালবাতি জ্বালিয়ে দিত, যদি তারা কেন্দ্রীয় সরকারের কোলে বসে দোল না খেত । অর্থাৎ ভারতের অঙ্গরাজ্য হিসাবে পশ্চিমবঙ্গ যদি কেন্দ্রীয় সরকারের থেকে প্রয়োজনের তুলনায় বেশি অর্থ বরাদ্দ না পেত আর সারা ভারত থেকে প্রয়োজনীয় সর্বপ্রকার দ্রব্যসামগ্রীর জোগান না পেত, তাহলে এই রাজ্যের মানুষকে না খেয়ে মরতে হত ।

এখন প্রশ্ন হচ্ছে, মার্কসবাদী সমাজতন্ত্রের ব্যর্থতার কারণ কী ? তার উত্তরে বলতে হয়,

১) কমিউনিজম জড়বাদের উপর আধারিত । এই ব্যবস্থায় জড়বাদ প্রাধান্য পাওয়ায় মানুষের মানসিক চিন্তা ও চাহিদা জড়কেন্দ্রিক হয়ে যায় । ফলে জড়বস্তু সম্ভোগের দিকে মানুষ লাগামহীনের মতোই ছুটে যায় ও ভোগ্য জড়সম্পদ আহরণে উন্মত্ত হয়ে ওঠে । যেহেতু মানুষের চাহিদা অনন্ত কিন্তু জড়সম্পদ সীমিত তাই ওই ভোগবাদী মানুষের চাহিদা কোনওদিনই পূরণ হয় না । আর চাহিদা পূরণ না হওয়া পর্যন্ত মানুষের অশান্তি-অসন্তোষের আগুন জ্বলতেই থাকবে ।

২) শ্রমিক কর্মচারীদের কাজে কোনও ইনসেনটিভ না থাকায় উৎপাদনে নিরুৎসাহিতা দেখা দেয়, অর্থাৎ তারা কাজে কর্মে দায়িত্বহীন হয়ে পড়ে ।

৩) মার্কসীয় সমাজব্যবস্থায় আধ্যাত্মিকতার স্থান নেই । মানুষের এই মৌলিক চাহিদা উপেক্ষিত থাকার ফলে মানুষের আত্মিক ক্ষুধা আধ্যাত্মিকতার দিকে পথ না পেয়ে জড়বস্তুতেই আবর্তিত হতে থাকে । অর্থাৎ অর্থ, বিষয় সম্পত্তি ও ভোগলিপ্সার মোহে তারা উন্মত্ত হয়ে ওঠে ।

৪) মার্কসীয় সমাজতান্ত্রিক ব্যবস্থায় সমস্ত ক্ষমতা ও সম্পদ রাষ্ট্রের হাতে কেন্দ্রীভূত থাকে বলে গড়ে ওঠে রাষ্ট্রীয় পুঁজিবাদ বা স্টেট ক্যাপিটালিজম । আর এই কেন্দ্রীভূত রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা ও সম্পদ ভোগ করে মুষ্টিমেয় কিছু পার্টিনেতা ও আমলা । তারাই তখন পরিণত হয় বুর্জোয়া শ্রেণিতে । এ-কথা অনেক মার্কসবাদী তাত্ত্বিক স্বীকারও করেছেন এই বলে যে একদিকে শ্রমিক শ্রেণির সঙ্গে সম্পর্কচ্ছেদ ও অন্যদিকে সমাজতান্ত্রিক নেতৃত্বের মধ্যে বুর্জোয়াসুলভ মনোভাব, দুর্নীতি, বিলাসবহুল জীবনযাপনের প্রবণতা (যেমন জ্যোতি বসু ও তস্য চেলাগণ) ও স্বজনপোষণের মতো বিভিন্ন অবাঞ্ছিত ঘটনা একের পর এক ঘটতে থাকে । তাহলে মার্কসীয় সমাজব্যবস্থায় যে বুর্জোয়া মনোভাব গড়ে ওঠার বড় সুযোগ বিদ্যমান তাও তো প্রমাণিত হল । অথচ কয়েকবছর আগেও কোনও সমাজসচেতন মানুষ মার্কসবাদে ত্রুটি আছে বললে, মার্কসবাদী গুণ্ডারা মারমুখী হয়ে প্রতিক্রিয়াশীল বা সিআইএর দালাল বলে তেড়ে আসত ।

৫) সর্বোপরি স্বাধীন চিন্তা ও বাকস্বাধীনতা মানুষের জন্মগত অধিকার । এই প্রকৃতিদত্ত অধিকারকে দাবিয়ে রাখতে গেলে গণক্ষোভের বিস্ফোরণ অবশ্যম্ভাবী হয়ে ওঠে, যা হয়েছে রাশিয়ায় । কিন্তু পশ্চিমবঙ্গ গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের অধীনে থাকায় মার্কসবাদীরা সেই অধিকার হরণ করতে পারে নি । যে পুঁজিবাদ শোষণ থেকে দেশের মানুষকে মুক্ত করার লক্ষ্যে মার্কসবাদের জন্ম সেই মার্কসবাদী দূরদৃষ্টির অভাবে ভ্রান্ত পথে পরিচালিত হয়ে আজ সেই পুঁজিবাদের কাছেই আত্মসমর্পণ করল ।

শেষপর্যন্ত বুদ্ধদেববাবু সাংবাদিক সম্মেলনে অত্যন্ত গর্বের সঙ্গে মার্কসীয় সমাজতন্ত্রের অকালমৃত্যু ঘোষণা করলেন । তাঁর পার্টিও এই ঘোষণাটা নীরবে মেনে নিলেন । সুতরাং ভারতের মার্কসবাদী কমিউনিস্ট পার্টি এখন একটি মৃতসত্ত্বা ।




1 comment:

Ragib said...

ভাই, বাংলা উইকিপিডিয়ায় আপনার অনুপস্থিতি খুব অনুভব করছি আমরা। ধরে নিচ্ছি কাজে ব্যস্ত বলে আপনি আর ওখানে যাচ্ছেন না এখন, কিন্তু সময় পেলে অবশ্যই আসবেন কিন্তু। আমি পশ্চিমবঙ্গের সব শহরের উপর নিবন্ধ যোগ করছি - অর্ধেকের মতো হয়ে গেছে। দয়া করে যদি আপনার নিজের জেলার শহর গুলি দেখে নিতেন, তাহলে খুবই ভাল হত। ক্যাটেগরি পশ্চিমবঙ্গের শহর থেকে শুরু করতে পারেন।

আশা করি যথা সময়ে আপনাকে আবার বাংলা উইকিপিডিয়াতে দেখতে পাব। আমরা ১০,০০০ নিবন্ধ ছাড়িয়ে গেছি সপ্তা খানেক আগে।

রাগিব