Showing posts with label রাজনীতি. Show all posts
Showing posts with label রাজনীতি. Show all posts

Saturday, May 30, 2009

পাল্টা হাওয়া

ছোটবেলা থেকেই দেখে আসছি দেওয়ালে কাস্তে হাতুড়ি তারা দেওয়া চিহ্ণ এবং লেখা সিপিআইএম প্রার্থীদের বিপুল ভোটে জয়ী করুন । আর তারপর সিপিআইএমই ভোটে জেতে । শুধু জেতে নয় বিপুল ভোটে জেতে । কি করে এভাবে বছরের পর বছর সিপিএম ভোটে জিতে আসে সেটা একটা রহস্য বলে মনে হত । কি লোকসভা কি বিধানসভা সবেতেই সিপিএমের জয়জয়কার । আমার শহরে ছোটবেলায় মনে আছে পৌরসভা কংগ্রেসের দখলে ছিল কিন্তু কিছু বছরের মধ্যেই সিপিএম সেটা দখল করল এবং শুধু দখল করা নয় তাকে তারা পরিণত করল বিরোধী শূন্য পৌরসভাতে । অধিকাংশ স্কুল, কলেজ, লাইব্রেরী, পঞ্চায়েত, জেলা পরিষদ সবই সিপিএম বা বামফ্রন্টের দখলে । দেওয়ালে দেওয়ালে লেখা বামফ্রন্টের বিকল্প শুধু উন্নততর বামফ্রন্ট ।

কিন্তু পশ্চিমবঙ্গে সিপিএমের এই সাফল্যের কারন কি ? তারা কি পশ্চিমবঙ্গকে কোনো স্বর্গরাজ্যে পরিণত করেছিল যে তাতে মানুষ এত খুশি হয়ে দীর্ঘসময় ধরে তাদের বিপুল ভোটে জিতিয়ে ক্ষমতায় রেখে দিয়েছিল । বরং বলা যায় সিপিএমের রাজত্বে পশ্চিমবঙ্গের অবনতি বেশি হয়েছে । বহু কলকারখানা বন্ধ হয়ে গেছে । শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলিতে পার্টির ক্যাডার বসিয়ে সেগুলির সর্বনাশ করা হয়েছে । যেখানে সেখানে হকার বসিয়ে স্টেশন রাস্তাঘাটকে বাজারে পরিণত করা হয়েছে । প্রোমোটারদের বেআইনী নির্মানে সহযোগিতা করা হয়েছে । পরিবহনকে চূড়ান্ত অব্যবস্হার মধ্যে নিয়ে যাওয়া হয়েছে । যেখানে সেখানে গজিয়ে উঠেছে দেশি মদ আর চুল্লুর ঠেক । কথায় কথায় রাস্তা অবরোধ আর বনধ । পশ্চিমবঙ্গ এমন একটি জায়গা যেখানে সরকারী মদতে বনধ পালিত হয় । প্রশাসন সব দেখেও কানা মামা হয়ে বসে থাকে। যেসমস্ত সৎ পুলিশ আর সরকারী অফিসার কিছু কাজ করতে চেয়েছেন তাঁদের সরিয়ে দেওয়া হয়েছে ।

১৯৭৭ সালে ক্ষমতায় আসার পরে বামফ্রন্ট গ্রামাঞ্চলে কিছু কাজ করেছিল । কংগ্রেস ছিল বড়লোকদের দল । সেই সময়ে জমিদারদের কাছ থেকে জমি নিয়ে তারা সাধারন কৃষকদের ভিতরে কিছু বিলিবন্দোবস্ত করেছিল। এছাড়াও গ্রামের উন্নতিও তারা কিছুকিছু করেছিল বলে মনে করা হয় । এই অবস্থা ১৯৭৭ থেকে ১৯৮৪ সাল পর্যন্ত চলে । ১৯৮৪ সালের লোকসভা নির্বাচনের আগে ইন্দিরা গান্ধী নিহত হওয়ায় প্রবল ইন্দিরা হাওয়ায় পশ্চিমবঙ্গে কংগ্রেস ১৬টি লোকসভা আসনে বিজয়ী হয় । সেই সময়েই সিপিএমের টনক নড়ে । তারা বুঝতে পারে যে গণতান্ত্রিক পদ্ধতিতে তাদের পক্ষে ক্ষমতা ধরে রাখা সম্ভব নাও হতে পারে । তাই তারা নির্বাচন প্রক্রিয়াতে জল মেশাতে শুরু করে । তাদের জল মেশানো শুরুর হয় ভোটার তালিকা তৈরি থেকে । ভোটার তালিকায় ভুয়ো ভোটার ঢোকানো হয় । এছাড়া যারা সিপিএম বিরোধী তাদের ভোটার তালিকা থেকে বাদ দেওয়া শুরু হয় । এরপর মানুষকে ভয় দেখিয়ে ভোটকেন্দ্রে আসতে না দেওয়া, ভোটের সময়ে বুথজ্যামকরা এবং পুলিশ প্রশাসনকে নিষ্ক্রিয় করে রাখা । তার উপরে সর্বোপরি ছিল ফলস ভোট এবং ছাপ্পা ভোট দেওয়া । যে সমস্ত মানুষেরা বাইরে থাকার জন্য ভোট দিতে আসতে পারবেন না তাঁদের তালিকা তৈরি করে তাদের ভোট দিয়ে দেওয়া হত । বিভিন্ন বয়েসী ক্যাডাররা যাদের মধ্যে পুরুষ এবং মহিলা উভয়ই ছিল তারা এই কাজগুলি পেশাদারী দক্ষতায় সম্পন্ন করত । অনেকেই ভোট দিতে গিয়ে ফিরে আসতেন । তাঁদের বলা হত ‘ভোট পড়ে গেছে’ । এবং এখানেই শেষ নয় ভোট গণনার সময়েও তারা নানা রকম কারচুপি করতে থাকে ।

যত দূরের গ্রাম হবে এই জালিয়াতির পরিমানও তত বেশি হবে । প্রত্যন্ত গ্রামগুলিতে দেখা যেত ভোট পড়ার হার সবচেয়ে বেশী । কারন এখানে ছাপ্পা ভোটের পরিমান সবচেয়ে বেশি হত । তাই কলকাতার কিছু কিছু জায়গায় সিপিএম ভোটে হারলেও জেলাগুলিতে তাদের জয়জয়কার সবসময়েই অক্ষুন্ন থাকত । তবে উত্তরবঙ্গের কিছু কিছু জায়গা যেমন মালদায় কংগ্রেসের শক্ত ঘাঁটি থাকায় সেখানে কংগ্রেস বিজয়ী হত ।

অবস্থা দেখে মনে হত সিপিএমকে হারানো মনে হয় সম্ভব নয় । তার উপরে বিরোধীরা নিজেদের মধ্যে গোষ্ঠীদন্দ্ব নিয়েই ব্যস্ত । ফলে সিপিএমের পোয়াবারো । এত কিছুর পরেও কিছু সাধারন মানুষের সমর্থন তাদের সাথে ছিল সে কথা স্বীকার করতেই হবে । না হলে এতবড় সংগঠন চালানো তাদের পক্ষে সম্ভব হত না । কিন্তু বহু বছর ক্ষমতায় দখলকরে রাখার পর তারা নৈতিক অধ:পতনের চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌছেছিল ।

জ্যোতি বসু পশ্চিমবঙ্গের সর্বনাশ করলেও তিনি দক্ষ রাজনীতিবিদ হওয়ার ফলে নানা ভাবে বহু সমস্যা পাশ কাটিয়ে গিয়েছিলেন । অন্তত তাঁর রাজনৈতিক বুদ্ধির অভাব ছিল না । আর প্রশাসনকে দক্ষভাবে তিনি চালাতেও জানতেন । কিন্তু তাঁর অবসর নেওয়ার পর বুদ্ধদেব ভট্টাচার্যের আমলে সিপিএম নানা বিষয়ে নাস্তানাবুদ হতে থাকে । রিজওয়ানুর হত্যা মামলা, সিঙ্গুর এবং নন্দীগ্রাম বিষয়ে সরকার জোর ধাক্কা খায় । তাদের ধারনা ছিল মেকি শিল্পায়নের টোপ দেখিয়ে রাজ্যবাসীকে তারা বোকা বানাবে । কিন্তু যে রাজ্যে পঞ্চাশ হাজারের উপর ছোটবড় কারখানা বন্ধ সেখানে একটি দুটি নতুন কারখানার কলা দেখিয়ে যে নির্বাচনী বৈতরনী পার করা যাবে না তা তারা বুঝতে পারেনি ।
২০০৯ এর লোকসভা নির্বাচনে অনেকের ধারনা ছিল জমি অধিগ্রহন বির্তকের ফলে গ্রামাঞ্চলে বামফ্রন্টের জনপ্রিয়তা কমেছে তাই হয়ত গ্রামের তাদের ফল খারাপ হবে কিন্তু শহরাঞ্চলের মানুষ যাঁদের কৃষিজমির উপর নির্ভরশীলতা কম তাঁরা তৃণমূল কংগ্রেসের মা মাটি মানুষের আন্দোলনকে প্রত্যাখ্যান করবেন । কিন্তু লোকসভার ভোটের ফল বেরোতে দেখা গেল সম্পূর্ণ অন্য গল্প । গ্রামাঞ্চলে তৃণমূলের ফল তো ভালোই আর শহরাঞ্চলে শুধু তাদেরই জয়জয়কার । কলকাতা এবং তার আশেপাশের প্রায় সমস্ত জায়গায় সিপিএম ধুয়ে মুছে সাফ হয়ে গেছে । সিপিএম পার্টি তার জন্মলগ্ন থেকে এত বড় ধাক্কা আর খায়নি । বহু আসনেই তারা বিপুল ভোটে পরাজিত । আর যে আসনগুলিতে তারা জিতেছে সেখানেও তাদের মার্জিন ব্যপকভাবে কমেছে । আর তারা যদি ভোটে জালিয়াতি না করত তাহলে তাদের ফল যে আরো খারাপ হত তাতে কোন সন্দেহ নেই ।

এবারের ভোটে জেতার জন্য সিপিএমের নেতারা যথাসাধ্য চেষ্টা করেছিলেন । পাবলিসিটির প্লাবনে ভেসে গিয়েছিল পশ্চিমবঙ্গ । বড় বড় ফ্লেক্স হোর্ডিং-এ ঢেকে দেওয়া হয়েছিল রাস্তাঘাট । উত্তর কলকাতা কেন্দ্রের প্রার্থী মহম্মদ সেলিমের জয় হো হোর্ডিংগুলি সিপিএম পার্টি থেকেই সরিয়ে নিতে বলা হয়েছিল । কারন এখানে দল থেকে প্রার্থীকে বড় করে দেখানো হয়েছিল । কিন্তু পার্টির আপত্তি সত্ত্বেও হোর্ডিংগুলি খোলা হয়নি । এছাড়াও মহম্মদ সেলিমকে হনুমান মন্দিরে গিয়ে চরণমৃত সেবন করতেও দেখা যায় । তখনই বোঝা গিয়েছিল যে কমিউনিস্ট নাস্তিকদের তাদের আদর্শের প্রতি আর কোন বিশ্বাস নেই । যেকোন উপায়ে তাদের ক্ষমতা দখল করতেই হবে ।

গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় যদি কোন পার্টি দীর্ঘদিন ক্ষমতায় থাকে (আমার মতে দশ বছর বা তার বেশি) তাহলে তাদের মধ্যে দুর্নীতি ঢুকতে বাধ্য । তাই সিপিএমের এই পরিণতি স্বাভাবিক । দুবছর পরে ২০১১ খ্রিষ্টাব্দে পশ্চিমবঙ্গে বিধানসভার ভোট । সেখানে হবে চূড়ান্ত পরীক্ষা । সিপিএম এবং বামফ্রন্টের অবস্থা যতই খারাপ হোক তারা অত সহজে যে হার মানবে না তা পরিষ্কার । আর বিরোধীদের পালে এখন হাওয়া । বত্রিশ বছরের মধ্যে এই প্রথম তারা বিধানসভায় জেতার স্বপ্ন দেখতে আরম্ভ করেছেন। আর অনেকেই স্বীকার করছেন যে সেটা সম্ভব । এটা অনেকটাই নির্ভর করছে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের উপর । রাজনৈতিক অদূরদর্শীতার জন্য তিনি খ্যাত । কিন্তু এখন তিনিও অনেক পরিণত । কেন্দ্রীয় সরকারের খুব গুরুত্বপূর্ণ জায়গায় তিনি রয়েছেন । এই মূহূর্তে তাঁর এবং তাঁর দলের ভালো কাজ তাঁকে আরো অনেকটাই এগিয়ে দিতে পারে ।

Sunday, January 07, 2007

সিঙ্গুরের পর নন্দীগ্রাম...পশ্চিমবাংলা কোন পথে

বুদ্ধদেব ভট্টাচার্যের নেতৃত্বে যখন বামফ্রন্ট গত নির্বাচনে বিপুল ভোটে জয়লাভ করেছিল তখন তার মধ্যে একটা অশনি সংকেত লুকিয়ে ছিল । নির্বাচনে বিপুল জয় সিপিএমের নেতাদের মধ্যে একটা ধারনা এনে দিয়েছে যে তাঁরা পশ্চিমবাংলায় এখন যা ইচ্ছে তাই করতে পারেন । তারই ফলস্বরূপ আমরা দেখতে পাচ্ছি যে গ্রামবাসীদের যেকোন উপায়ে উৎখাত করে শিল্পস্থাপন করবার জন্য তাঁরা উঠে পড়ে লেগেছেন । এরজন্য কখনও পুলিশ আবার কখনও বা সিপিএমের ক্যাডার বাহিনীকে লেলিয়ে দেওয়া হচ্ছে গ্রামবাসীদের উপরে । আর বার বার বলা হচ্ছে যে এই সব গণ্ডোগোল নাকি বহিরাগতদের কাজ ।

এখন প্রশ্ন হচ্ছে বহিরাগত কারা ? একজন পশ্চিমবঙ্গ বাসী কি পশ্চিমবঙ্গের ভিতরেই বহিরাগত হতে পারেন । অথবা একজন ভারতবাসী ভারতবর্ষের ভিতরে । সুতরাং একজন পশ্চিমবঙ্গবাসী অথবা ভারতের যেকোন জায়গার লোক যদি এই সব কৃষকদের পাশে গিয়ে দাঁড়ান তবে তাঁদের বহিরাগত বলা হবে কেন ? আর মাত্র কয়েকজন বহিরাগতদের পক্ষে কি সম্ভব গ্রামবাসীদের প্রভাবিত করা । আর যদি তাঁরা বহিরাগতই হবেন তবে গ্রামবাসীরা এই বহিরাগতদের কথা শুনবেন কেন ?

কাল রাতে নন্দীগ্রামে বিশাল সংঘর্ষ হয়েছে এবং তাতে ছয় সাত জনের এখনও অবধি মৃত্যু হয়েছে । এবং এই সংঘর্ষের সময়ে কোন পুলিশের দেখা মেলেনি । অথচ বেশ কয়েকদিন ধরেই নন্দীগ্রাম উত্তাল এবং খবরের শিরোনামে সুতরাং সেখানে প্রশাসনের আগে থেকেই সতর্ক থাকা প্রয়োজন ছিল । তার মানে সিপিএমের গুন্ডাবাহিনী গ্রাম আক্রমন যাতে সুষ্ঠুভাবে করতে পারে সেজন্যই পুলিশ নিষ্ক্রিয় ভাবে বসে ছিল । এখন সাংসদ লক্ষণ শেঠের প্ল্যান হল গ্রাম আক্রমন করে গ্রামের পুরুষদের গ্রাম থেকে তাড়িয়ে দিয়ে গ্রামগুলোকে দখল করে নেওয়া । যা সিপিএম কেশপুরে করে এসেছে বহুদিন ধরে ।

কিন্তু গ্রামের মানুষ এত সহজে ছেড়ে দেবে না । কমিউনিস্টদের অনেক বুড়ো নেতা এখনও বিশ্বাস করেন যে দেশে বিপ্লব হবে । এবার মনে হচ্ছে যে পশ্চিমবঙ্গে সত্যিই বিপ্লব আসতে চলেছে খালি একটাই পার্থক্য যে বিপ্লবটা আসছে তাঁদের বিরুদ্ধেই । সিপিএমের পতাকায় আর কাস্তে হাতুড়ি রাখার কোন মানে হয় না । তাঁদের জঙ্গী ট্রেড ইউনিয়ন গুলো অনেক আগেই হাতুড়ির ঘা দিয়ে বহু শিল্প ধ্বংস করেছে । এবং এখন মেকি শিল্পায়নের নামে কৃষির উপরেরও আঘাত হানছে ।

শিল্পায়নের প্রশ্নে যদি পশ্চিমবঙ্গ সরকার প্রথম থেকে স্বচ্ছ নীতি গ্রহন করত তবে হয়ত এই সমস্যা তৈরি হত না । গ্রামবাসীদের বলা হচ্ছে চাকরি দেওয়া হবে টাকা পয়সা দেওয়া হবে । কিন্তু আমাদের দেশে যেখানে সমস্ত কাজেই আঠারো মাসে বছর, সেখানে এই সুযোগ সুবিধা না পাওয়ার সম্ভাবনা সব সময়েই থেকে যায় । জমি নিয়ে নেওয়ার পর হয়ত দেখা গেল চাষীরা টাকা পয়সা সুযোগ সুবিধা সব পেলেন না । তাই গ্রামের মানুষদের আগে অন্য জায়গায় ঠিক ভাবে প্রতিষ্ঠিত করতে হবে তারপরেই তাঁদের জমি অধিগ্রহন করতে হবে । এব্যাপারে তাড়াহুড়ো করলে চাষীরা কখনই ছেড়ে কথা কইবে না ।

Sunday, December 10, 2006

জ্যোতি বসুকে ডি লিট উপাধি দিচ্ছে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় ।

সংবাদ প্রতিদিনের ওয়েবসাইটে খবরটা পড়ে খুব একটা আশ্চর্য হলাম না । তারা যদি লালু প্রসাদ যাদব বা রাবড়ি দেবীকেও যদি কোন দিন ডি লিট দেয় তাহলেও খুব একটা আশ্চর্য হব না ।

জ্যোতি বাবু কি এমন হাতি ঘোড়া মেরেছেন যে তাঁকে এই সম্মান দিতে হবে ? এই সম্মান তাঁর থেকে অনেক যোগ্য বহু মানুষকেই দেওয়া যেতে পারত । জ্ঞান হওয়া ইস্তক দেখে আসছি গরমকালে তিনি হয় ইংল্যান্ডে বেড়াতে যাচ্ছেন শিল্পপতি ধরার নামে অথবা উত্তর বঙ্গের কোন বাংলোয় টুরিস্টদের রিজার্ভেশন বাতিল করে নিজে গিয়ে জাঁকিয়ে বসছেন সেখানে ।

তাঁর বহু বছরের রাজত্বকালে তিনি দুটি মাত্র কীর্তি করেছেন । সে দুটি হল নন্দন আর চন্দন । এছাড়া পশ্চিমবঙ্গের জন্য তিনি আর ভাল কিছু করেছেন বলে আমার মনে পড়ছে না । শিক্ষা, স্বাস্থ্য, এবং শিল্পায়নে, পরিবহনে তিনি চূড়ান্ত ব্যর্থ । তাঁর সরকার বাচ্চাদের ইংরাজী পড়ানো বন্ধ করে দিয়েছিল । তাঁর সরকার কম্পিউটারের বিরোধিতা করেছিল । তিনি এবং তাঁর দল একসময় নেতাজী সুভাষচন্দ্রের বিরোধিতা করেছিলেন । বর্তমান মুখ্যমন্ত্রী বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য একসময় তাঁর মন্ত্রীসভা ত্যাগ করে বলেছিলেন চোরেদের সরকার তিনি একসময় বিজেপিকে বলেছিলেন অসভ্য বর্বর । আবার তিনি নিজেই একসময় রাজীব গান্ধীকে আটকানোর জন্য অটল বিহারী বাজপেয়ীর হাত ধরে ব্রিগেডে সভা করেছিলেন । নির্মম সব ঘটনা সম্পর্কে তিনি বরাবরই নির্বিকার থেকেছেন । মহিলাদের শ্লীলতাহানির পরে তাঁর মন্তব্য ছিল এরকম তো কতই হয় । একজন কমিউনিস্ট এবং সর্বহারাদের নেতা হয়েও তিনি বরাবরই বিলাসী জীবনযাপন করেছেন । এখনও তিনি সল্টলেকে রাজার হালে জীবন কাটাচ্ছেন সরকারের টাকা বরবাদ করে । তাঁর ঘুমের ব্যাঘাত হওয়ায় কিছু শিয়ালের প্রাণ গিয়েছিল যাদের বন্যপ্রানী আইনের ফলে মারা নিষিদ্ধ । তাঁর কীর্তির কথা আর কত বলব ।

তাঁর ব্যর্থতার কথা প্রসঙ্গে তিনি সব সময়েই বলতেন কেন্দ্রীয় সরকারের ভুল নীতি আর অসহযোগিতার কারনের তিনি সব কাজ করতে পারছেন না । অথচ কলকাতার দুটি প্রধান উন্নয়ন মূলক কাজ পাতাল রেল আর দ্বিতীয় হুগলি সেতু কেন্দ্রীয় সরকারের সাহায্যের ফলেই শেষ হয়েছিল । মনে রাখতে হবে ভারতের মধ্যে কলকাতাতেই প্রথম পাতাল রেল হয়েছিল । কেন্দ্রীয় সরকার যদি সবসময়েই পশ্চিমবঙ্গের প্রতি বিমাতৃসুলভ আচরন করত তাহলে বোধহয় কলকাতাতে পাতাল রেল তৈরি হত না ।

এ হেন মানুষকে ডি লিটের জন্য নির্বাচিত করে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় বুঝিয়ে দিল যে তারা দায়বদ্ধ শুধু রাজনৈতিক নেতাদের কাছে ।

কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় তো নিজেদের কাজগুলোই ঠিকভাবে করতে পারে না । আমি পার্ট ওয়ান পরীক্ষায় যে পেপার সবথেকে ভাল পরীক্ষা দিলাম তাতে পেলাম সবথেকে কম নম্বর । আর যে পেপার সবথেকে খারাপ দিলাম তাতে পেলাম সবথেকে বেশী নম্বর । আমার মামাতো ভাই পশ্চিবঙ্গের বাইরের একটি নামকরা বিশ্ববিদ্যালয়ে খুব ভালো সুযোগ পেয়েও যেতে পারল না শুধু এই কারনে যে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় রেজাল্ট আউট করতে দেরী করল । আমার শহরের একটি কলেজের মেয়েরা সবাই একসাথে ইতিহাসে ব্যাক পেল । একশোর উপর মেয়ে কিভাবে যে ইতিহাসে ব্যাক পেতে পারে তার ব্যাখ্যা কেবল কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ই দিতে পারে । যে বিশ্ববিদ্যালয় একসময় ভারতের সেরা বিশ্ববিদ্যালয়ের অন্যতম ছিল আজ তার স্থান নামতে নামতে কোথায় এসে পৌছেছে কেউ বলতে পারে না ।

সুতরাং কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের কাছ থেকে এর থেকে বেশি কিছু বিচক্ষনতা আশা করা যায় না । আপনি যদি কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে কিছু সম্মান আশা করেন তবে অবশ্যই সিপিএমে নাম লেখান ।

Monday, December 04, 2006

সিঙ্গুরের খবর আর মিডিয়া

সিঙ্গুর নিয়ে প্রায় প্রতিদিনই কিছু না কিছু ক্যাঁচাল হচ্ছে । অফিসে থেকে ফেরার সময় প্রায় প্রতিদিনই মারাত্মক ভিড়ের সম্মুখীন হতে হচ্ছে । কারন ট্রেনের গণ্ডগোল । আজ সন্ধে ছটার সময়ে যখন বিধাননগর স্টেশনে এলাম তখন দেখলাম স্টেশনে প্রচণ্ড ভিড় । এক নম্বর প্ল্যাটফর্মে দাঁড়ানোর জায়গা নেই ট্রেনে ওঠা তো অনেক পরের ব্যাপার । কেউই ঠিক বলতে পারছে না যে আসলে কি হয়েছে । সাধারন ট্রেনের গণ্ডগোল না কোথাও অবরোধ হয়েছে । সিঙ্গুর ইসুকে নিয়ে প্রায় প্রত্যেক দিনই কোথাও না কোথাও অবরোধ হচ্ছে । যাই হোক দুটো ট্রেন ছেড়ে দেবার পর অবশেষে তৃতীয় ট্রেনে উঠতে সক্ষম হলাম । সেই ট্রেনটা আবার দমদম স্টেশনে প্রচণ্ড ভিড় নিয়ে অনেকক্ষন দাঁড়িয়ে রইল ।

আগামী কাল আবার এসইউসিআই আর সিপিআই এম এল বনধ ডেকেছে । আজ মাওবাদীরা কলকাতার বেকবাগানের কাছে টাটা মোটরসের শোরুমে হামলা চালিয়েছে এবং বুদ্ধবাবুর বিরুদ্ধে পোস্টার সেঁটে গেছে । এসইউসিআই দল হিসাবে ছোট হলেও কোথাও কোথাও তাদের যথেষ্ট শক্তি রয়েছে । এবং আমার মনে হয় পশ্চিমবঙ্গে যতগুলি রাজনৈতিক দল রয়েছে তাদের ভিতরে এসইউসিআই সবচেয়ে সিরিয়াস নিজেদের আন্দোলনের বিষয়ে । এবং তাদের যথেষ্ট ডেডিকেটেড কর্মী রয়েছে যারা দলকেই নিজের ধ্যানজ্ঞান বলে মনে করে । এরাই আমার মনে হয় পশ্চিমবঙ্গে কমিউনিস্ট আন্দোলনের বর্তমান ধারক ও বাহক । কারন মাওবাদীরা অনেকাংশেই সাধারন মানুষের থেকে বিচ্ছিন্ন । এবং সিপিআইএমকে এখন আর বামপন্থী বলে মেনে নেওয়া যায় না । তারা তাদের যেটুকু আদর্শ বাকি ছিল তা জলাঞ্জলি দিয়েছে । এখন অনেকেই জর্জ বুশের ইরাক দখলের সঙ্গে বুদ্ধবাবুর সিঙ্গুর দখলের তুলনা টানছেন । আমার মনে হয় কালকে হয়তো এসইউসিআই ট্রেন অবরোধ করে দিতে পারে । কালকে অবশ্যই আমি অফিসে যাবার জন্য বেরোবো । দেখি গিয়ে উঠতে পারি কি না ।

পশ্চিমবঙ্গের মিডিয়া এখন অনেকাংশেই সিপিএমের ধামাধরা হয়ে গিয়েছে । এর মধ্যে সব থেকে উল্লেখযোগ্য হল আনন্দবাজার পত্রিকা । আনন্দবাজার এখন বামফ্রন্টকে সাপোর্টের ক্ষেত্রে যেন গণশক্তিকে হার মানাতে চলেছে । তাদের এই রহস্যজনক নীতি পরিবর্তনের পিছনে যে কোন উদ্দেশ্য আছে তা স্পষ্টতই বোঝা যাচ্ছে । এর সাথে যুক্ত হয়েছ তাদের চ্যানেল স্টার আনন্দ । বলা চলে গত বিধানসভা নির্বাচনের আগে থেকেই পশ্চিমবঙ্গের মিডিয়া যেন বুদ্ধপন্থী হয়ে উঠেছে । কলকাতা টিভিও সিপিএমকেই সাপোর্ট করবে এতো জানা কথা । কারণ তাদের মালিক জেনেটিস এর সঙ্গে বুদ্ধবাবুর অনেক দহরম মহরম আছে । ফলে সিঙ্গুর ইসুতে ঠিক কি ঘটছে তা বোঝা অনেকটাই শক্ত হয়ে উঠছে । পশ্চিমবঙ্গের বাংলা টিভি চ্যানেল আর পশ্চিমবঙ্গের বাইরের সর্বভারতীয় টিভি চ্যানেলগুলির সঙ্গে খবরের তফাত অনেকরই নজরে এসেছে । এখন নিরপেক্ষ খবর পাওয়া সবথেকে কঠিন বিষয় হয়ে উঠেছে । কারণ পশ্চিমবঙ্গের মিডিয়ার মেরুকরণ প্রায় সম্পূর্ণ । নিরপেক্ষ খবরের কাগজ বা টিভি চ্যানেলের কোন অস্তিত্ব আর নেই । সিঙ্গুর ইসুতে যা বুঝলাম তাতে আনন্দবাজার, গণশক্তি আর আজকাল বুদ্ধবাবুর পক্ষে রায় দিচ্ছে এবং সংবাদ প্রতিদিন এবং বর্তমান যাচ্ছে বুদ্ধবাবুর বিপক্ষে । টিভিচ্যানেলগুলোর সেই একই দশা । তাই মনে হয় আমাদের তাকিয়ে থাকতে হবে সর্বভারতীয় খবরের কাগজ আর টিভিচ্যানেল গুলোর দিকে । যদি তারা অন্তত কিছুটা নিরপেক্ষ খবর দেয় ।

Sunday, December 03, 2006

সিঙ্গুর ইসুতে পশ্চিমবঙ্গ সরকারের ভুমিকা

পশ্চিমবঙ্গে কিছুদিন ধরেই সিঙ্গুর নিয়ে ঝামেলা পাকিয়ে উঠেছে । মমতা, বুদ্ধবাবু এবং তার সাথে যুক্ত হয়েছেন মেধা পাটেকর । সিপিআই এম এল (নকশাল) এবং এসইউসিআই এর মতো ছোট দলেরাও এর মধ্যে নাক গলিয়ে ফেলেছে । ফলে অবস্থা এখন বেশ সরগরম ।

কিন্তু এই ঝামেলা পাকিয়ে ওঠার জন্য দায়ী কে ? অবশ্যই আমাদের রাজ্য সরকারের দূরদৃষ্টিহীনতাই এর জন্য দায়ী । সবাই জানে যে কৃষকদের কাছে তাদের জমি হচ্ছে মহামূল্যবান । বংশ পরম্পরায় জমিই তাদের খাবার জুগিয়েছে । ভালো হোক খারাপ হোক জমিকে নির্ভর করেই তারা বেঁচে আছে । এরপর সিঙ্গুর হচ্ছে হুগলী জেলায় । সবাই জানে যে এই জেলা খুবই উর্বর । হুগলী জেলা বিখ্যাত হচ্ছে আলু চাষের জন্য । আর এখানকার চাষীদের অবস্থা বাঁকুড়া, পুরুলিয়া বা মেদিনীপুরের চাষীদের থেকে অনেক ভালো ।

রাজ্য সরকারের বক্তব্য হচ্ছে যে টাটাদের কারখানা হলে গ্রামের মানুষেরা সেখানে চাকরি পাবেন । কিন্তু এর পরেও প্রচুর প্রশ্ন থেকে যায় । যেমন গ্রামের মানুষদের কত টাকা মাইনের চাকরি দেওয়া হবে ? তাদের চাকরিতে নিলেও কিছুদিন বাদে যে তাড়িয়ে দেওয়া হবে না তার নিশ্চয়তা কোথায় ? আর যে সমস্ত চাষীরা এতদিন স্বাধীন ভাবে নিজেদের জমি চাষ করে এসেছেন তাঁরা কি অন্যের অধীনে চাকরি আদৌ করতে পারবেন ? আর বেশিরভাগ মধ্যবয়েসী কৃষকরা এতদিন চাষ করে এসেছেন এবং চাষের কাজে পটু তাঁরা কি কারখানার কাজে পটুত্ব অর্জন করতে পারবেন ?

এরপর সেখানে যদি সরকারী উদ্যোগে কিছু করা হত তাহলেও জমি ছেড়ে দেবার পক্ষে একটা যুক্তি থাকত । কিন্তু মনে রাখতে হবে সেখানে একটি বেসরকারী কারখানা স্থাপন করা হচ্ছে । আর সেখানে টাটারা যে কেবল নিজেদের লাভই দেখবে তাতো জানা কথা ।

আরও প্রশ্ন হল টাটারা যদি পশ্চিমবঙ্গে কারখানা খুলতে চায় তাহলে তো তারা জমির মালিকদের কাছ থেকে সরাসরি জমি কিনলেও পারত । এখানে রাজ্য সরকারের ভূমিকাটা কোথায় সেটা স্পষ্ট নয় । এখানে এটা স্পষ্ট যে রাজ্য সরকার জমির দালালি করছে । জমি পিছু চাষীদের যে টাকা দেওয়া হচ্ছে আর রাজ্য সরকার টাটাদের কাছ থেকে যে টাকা নিচ্ছে তার মধ্যে বিরাট ফারাক আছে । এই ফারাক থাকা উচিত নয় । পুরো টাকাটাই চাষীদের প্রাপ্য ।

অতএব অনেক কিছুতেই বিরাট প্রশ্ন চিহ্ন আছে । সিঙ্গুর ইসুর গুরুত্ব খুবই বেশী । কারণ এর উপরেই নির্ভর করবে ভবিষ্যতে পশ্চিমবঙ্গের শিল্পায়নের রূপরেখা কি হবে । এবং অন্যান্য জায়গায় জমি অধিগ্রহন ও শিল্পায়ন কিভাবে হবে । টাটারা যখন একশো বছরেরও বেশী আগে জামশেদপুরে কারখানা খুলেছিল তখন সেই জায়গাটা ছিল একেবারই অনুন্নত । সিঙ্গুরের কারখানা খোলার আগেও টাটারা সেই নীতি গ্রহন করতে পারত । হুগলী জেলার মত উর্বর জায়গায় তারা কারখানা না খুলে পশ্চিমবঙ্গের অনুন্নত জায়গায় যথা বাঁকুড়া, পুরুলিয়া, মেদিনীপুর বা উত্তরবঙ্গে কারখানা খুললে সেখান কার মানুষেরা দু হাত বাড়িয়ে তাঁদের স্বাগত জানাত ।

সিঙ্গুর নিয়ে সিপিএম যদি ঠিক নীতিতে না আসে তাহলে পশ্চিমবঙ্গে তাদের সবথেকে বড় শক্তি কৃষিজীবি গ্রামের মানুষেরাই তাঁদের বিপক্ষে চলে যাবেন সে বিষয়ে কোন সন্দেহ নেই । তারপর পুলিশ লেলিয়ে সাধারন মানুষের উপর দমন নিপীড়ন যা তারা বহু বছর ধরে চালিয়ে আসছে তা সাধারন মানুষ কিছুতেই সহ্য করে নেবে না ।

Saturday, December 02, 2006

যারা পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভায় ভাঙচুর করল তাদের কি শাস্তি হওয়া উচিত ?

গত ৩০ নভেম্বর তারিখে আমরা দেখলাম পশ্চিমবঙ্গের বিধানসভায় এক বিরাট ভাঙচুরের দৃশ্য । তৃণমূল কংগ্রেসের বিধায়করা প্রবল তাণ্ডব চালালেন বিধানসভার ভিতরে । তা যাই হোক এই বিধায়কদের কি শাস্তি দেওয়া যেতে পারে সে বিষয়ে ভাবনা চিন্তা করছিলাম । এমন সময় মনে পড়ে গেল আমাদের স্কুল জীবনের কথা ।

এই বিধায়কদের উপযুক্ত শাস্তি হতে পারে এরকম । প্রথমে তাদের বিধানসভা চত্বরে কান ধরে নিলডাউন করে রাখতে হবে বেশ কয়েক ঘন্টা । সে সময়ে তাদের কোন কিছু খাওয়া বা বাথরুম যাওয়া একেবারে নিষিদ্ধ । তারপর তাদের কান ধরে ওঠবোস করতে হবে একশো এক বার । এই সময় স্কুলের বাচ্চাদের বিধানসভা চত্বরে আনতে হবে যাতে তারা এই বিচিত্র দৃশ্য দেখার আনন্দ উপভোগ করতে পারে । এরপর বিধায়কদের কষ্ট লাঘব করার জন্য বাচ্চারা তাদের নরম কচি হাত দিয়ে তাদের কান মুলে দিতে পারে । যাতে তাদের কিছুটা আরাম হয় । আশা করি বাচ্চাদের হাতের কানমলা খেতে তাদের ভালোই লাগবে ।

এরপর বিধায়কদের দিয়েই বিধানসভা ভবন পরিষ্কার করাতে হবে । কোন সাফাইকর্মী আনা চলবে না । এরপর যে বিধায়করা বেশি বদমায়েশি করেছিলেন তাদের পশ্চাৎদেশে কয়েক ঘা বেত্রাঘাত করা যেতে পারে ।

আমাদের সরকার পক্ষের বিধায়করাও অনেক সময়ে নানা রকমের ভাঙচুরের জন্য দায়ী । একই সাথে যদি তাদের পাওনাটাও মিটিয়ে দেওয়া যায় তাহলে ব্যাপারটা স্বয়ংসম্পূর্ণ হয় ।

Monday, October 09, 2006

মার্কসবাদের বর্তমান অবস্থা

 গত ১৭ই সেপ্টেম্বরের দেশ পত্রিকায় আগরতলার অরুন্ধতীনগর থেকে প্রদীপবিকাশ রায়ের বর্তমান পশ্চিমবঙ্গের মার্কসবাদী সরকার এবং সাধারনভাবে মার্কসবাদের উপরে একটি চিঠি প্রকাশিত হয়েছে । তাঁর এই চিঠি ব্যক্তিগত ভাবে কমিউনিস্টদের সম্পর্কে আমার মতামতের সঙ্গে মিলে যায় । নিচে তাঁর চিঠি থেকে খানিক অংশ তুলে দিলাম ।

কলকাতার প্রেস ক্লাবে ‘মিট দ্য প্রেস’ অনুষ্ঠানে সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের উত্তরে মার্কসবাদী নেতা তথা মুখ্যমন্ত্রী বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য একবার বলেছিলেন সমাজতন্ত্র কায়েম করতে পারব না । সমাজতন্ত্র হবেও না । আমি এখানে পুঁজিবাদ করছি । পুঁজিবাদকে শ্রমিক ও সাধারন মানুষের স্বার্থে কাজে লাগানোর চেষ্টা করছি ।

তাহলে বিগত কয়েক যুগ ধরে মার্কসবাদী বিপ্লবীরা যে বিপ্লব বিপ্লব খেলায় এত আস্ফালন করলেন, লক্ষ লক্ষ মানুষের রক্তপাত ঘটালেন, সমাজতন্ত্র নামক সোনার অশ্বডিম্ব দেওয়ার এত স্বপ্ন দেখালেন -- সবই ছিল প্রহসন ? সবই ছিল ধোঁকাবাজি ?

মার্কসবাদের অর্থনীতিতে মারাত্মক ত্রুটির অনিবার্য পরিণামেই আজ থেকে ১৫ বছর আগে অর্থাৎ ১৯৯১ সালে রাশিয়া সহ পূর্ব ইউরোপের রাষ্ট্রগুলিতে মার্কসবাদী শাসনের পতন হওয়ার পরেও, মার্কসবাদী তাত্ত্বিকরা সেই অলীক সমাজতন্ত্রের স্বপ্ন দেখা ছাড়েননি । মার্কসবাদের পতনের জন্য দায়ী ত্রুটিগুলি স্বীকার করে নিয়েও শুধু আত্মগ্লানি বিমোচনের জন্য ও ফোস্কা পড়া গায়ে সান্ত্বনার প্রলেপ দেওয়ার জন্য সেই সময়কার কিছু বামপন্থী তাত্ত্বিক লিখেছেন, মার্কসবাদ একটি বিজ্ঞানপ্রসূত সত্য । এ বড় হাস্যকর যুক্তি ! বরং বলা ভাল এ এক অদ্ভুত অন্ধবিশ্বাস মার্কসবাদের প্রতি ।

বুদ্ধদেব বাবুর এই ঐতিহাসিক উক্তির পরেও কি আর মার্কসবাদ একটি বিজ্ঞানপ্রসূত সত্য থাকে ? পুঁজিবাদের অবসানের জন্য যে মার্কসবাদের জন্ম, সেই মার্কসবাদের দ্বারা অনেক রক্তপাত ঘটানোর পর সেই পুঁজিবাদের পদতলেই তার পরিসমাপ্তি ঘটল ! সভ্যতার ইতিহাসে এ যে কত বড় পরাজয়, তা বোঝার মত মুক্তবুদ্ধি কি আর আছে ? তথাকথিত বাম বুদ্ধিজীবিদের মস্তিষ্ক যে অসাড় হয়ে গিয়েছিল, ভ্রান্ত পথে ছুটে তাঁরা যে আত্মঘাতী আস্ফালনে উন্মত্ত হয়ে উঠিছিলেন, তাঁরা যে মার্কসবাদ নামে এক মারাত্মক মায়াহরিণের পিছনে ছুটে আজ এই নৈতিক অপমৃত্যুর মুখে এসে দাঁড়িয়েছেন, তা বোঝার মতো নৈতিক চেতনা কি তাঁদের আছে ?

রাশিয়া ও পূর্ব ইউরোপের কমিউনিস্ট দেশগুলির পতনের পর যাঁরা সেইসব দেশে গিয়েছেন সেই প্রত্যক্ষদর্শীদের দৃষ্টিতে যে কারণ ধরা পড়েছে তা হচ্ছে, সেইসব সমাজতান্ত্রিক দেশগুলির পতনের মূলে রয়েছে দুটি প্রধান কারণ -- প্রথম, খাদ্য ও নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যের তীব্র অভাব আর দ্বিতীয়টি ব্যক্তিস্বাধীনতা, বাকস্বাধীনতার অনধিকার ।

অনেকে প্রশ্ন করেন, পশ্চিমবঙ্গে তো কমিউনিস্ট সরকার তিরিশ বছর ধরে শাসন চালাচ্ছে, কই সেখানে তো রাশিয়ার মতো এমন দেউলিয়া হয়ে যায়নি ? তার উত্তরে বলতে হয় -- পশ্চিমবঙ্গও কবেই দেউলিয়া হয়ে গিয়ে বামফ্রন্ট সরকারের লালবাতি জ্বালিয়ে দিত, যদি তারা কেন্দ্রীয় সরকারের কোলে বসে দোল না খেত । অর্থাৎ ভারতের অঙ্গরাজ্য হিসাবে পশ্চিমবঙ্গ যদি কেন্দ্রীয় সরকারের থেকে প্রয়োজনের তুলনায় বেশি অর্থ বরাদ্দ না পেত আর সারা ভারত থেকে প্রয়োজনীয় সর্বপ্রকার দ্রব্যসামগ্রীর জোগান না পেত, তাহলে এই রাজ্যের মানুষকে না খেয়ে মরতে হত ।

এখন প্রশ্ন হচ্ছে, মার্কসবাদী সমাজতন্ত্রের ব্যর্থতার কারণ কী ? তার উত্তরে বলতে হয়,

১) কমিউনিজম জড়বাদের উপর আধারিত । এই ব্যবস্থায় জড়বাদ প্রাধান্য পাওয়ায় মানুষের মানসিক চিন্তা ও চাহিদা জড়কেন্দ্রিক হয়ে যায় । ফলে জড়বস্তু সম্ভোগের দিকে মানুষ লাগামহীনের মতোই ছুটে যায় ও ভোগ্য জড়সম্পদ আহরণে উন্মত্ত হয়ে ওঠে । যেহেতু মানুষের চাহিদা অনন্ত কিন্তু জড়সম্পদ সীমিত তাই ওই ভোগবাদী মানুষের চাহিদা কোনওদিনই পূরণ হয় না । আর চাহিদা পূরণ না হওয়া পর্যন্ত মানুষের অশান্তি-অসন্তোষের আগুন জ্বলতেই থাকবে ।

২) শ্রমিক কর্মচারীদের কাজে কোনও ইনসেনটিভ না থাকায় উৎপাদনে নিরুৎসাহিতা দেখা দেয়, অর্থাৎ তারা কাজে কর্মে দায়িত্বহীন হয়ে পড়ে ।

৩) মার্কসীয় সমাজব্যবস্থায় আধ্যাত্মিকতার স্থান নেই । মানুষের এই মৌলিক চাহিদা উপেক্ষিত থাকার ফলে মানুষের আত্মিক ক্ষুধা আধ্যাত্মিকতার দিকে পথ না পেয়ে জড়বস্তুতেই আবর্তিত হতে থাকে । অর্থাৎ অর্থ, বিষয় সম্পত্তি ও ভোগলিপ্সার মোহে তারা উন্মত্ত হয়ে ওঠে ।

৪) মার্কসীয় সমাজতান্ত্রিক ব্যবস্থায় সমস্ত ক্ষমতা ও সম্পদ রাষ্ট্রের হাতে কেন্দ্রীভূত থাকে বলে গড়ে ওঠে রাষ্ট্রীয় পুঁজিবাদ বা স্টেট ক্যাপিটালিজম । আর এই কেন্দ্রীভূত রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা ও সম্পদ ভোগ করে মুষ্টিমেয় কিছু পার্টিনেতা ও আমলা । তারাই তখন পরিণত হয় বুর্জোয়া শ্রেণিতে । এ-কথা অনেক মার্কসবাদী তাত্ত্বিক স্বীকারও করেছেন এই বলে যে একদিকে শ্রমিক শ্রেণির সঙ্গে সম্পর্কচ্ছেদ ও অন্যদিকে সমাজতান্ত্রিক নেতৃত্বের মধ্যে বুর্জোয়াসুলভ মনোভাব, দুর্নীতি, বিলাসবহুল জীবনযাপনের প্রবণতা (যেমন জ্যোতি বসু ও তস্য চেলাগণ) ও স্বজনপোষণের মতো বিভিন্ন অবাঞ্ছিত ঘটনা একের পর এক ঘটতে থাকে । তাহলে মার্কসীয় সমাজব্যবস্থায় যে বুর্জোয়া মনোভাব গড়ে ওঠার বড় সুযোগ বিদ্যমান তাও তো প্রমাণিত হল । অথচ কয়েকবছর আগেও কোনও সমাজসচেতন মানুষ মার্কসবাদে ত্রুটি আছে বললে, মার্কসবাদী গুণ্ডারা মারমুখী হয়ে প্রতিক্রিয়াশীল বা সিআইএর দালাল বলে তেড়ে আসত ।

৫) সর্বোপরি স্বাধীন চিন্তা ও বাকস্বাধীনতা মানুষের জন্মগত অধিকার । এই প্রকৃতিদত্ত অধিকারকে দাবিয়ে রাখতে গেলে গণক্ষোভের বিস্ফোরণ অবশ্যম্ভাবী হয়ে ওঠে, যা হয়েছে রাশিয়ায় । কিন্তু পশ্চিমবঙ্গ গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের অধীনে থাকায় মার্কসবাদীরা সেই অধিকার হরণ করতে পারে নি । যে পুঁজিবাদ শোষণ থেকে দেশের মানুষকে মুক্ত করার লক্ষ্যে মার্কসবাদের জন্ম সেই মার্কসবাদী দূরদৃষ্টির অভাবে ভ্রান্ত পথে পরিচালিত হয়ে আজ সেই পুঁজিবাদের কাছেই আত্মসমর্পণ করল ।

শেষপর্যন্ত বুদ্ধদেববাবু সাংবাদিক সম্মেলনে অত্যন্ত গর্বের সঙ্গে মার্কসীয় সমাজতন্ত্রের অকালমৃত্যু ঘোষণা করলেন । তাঁর পার্টিও এই ঘোষণাটা নীরবে মেনে নিলেন । সুতরাং ভারতের মার্কসবাদী কমিউনিস্ট পার্টি এখন একটি মৃতসত্ত্বা ।