Showing posts with label ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা. Show all posts
Showing posts with label ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা. Show all posts

Monday, February 22, 2010

লিখতে হবে বাংলায়

বেশ কিছুদিন হল এই ব্লগে আর লেখা হচ্ছে না । প্রথম এই ব্লগে লিখতে শুরু করেছিলাম প্রায় চার বছর আগে ২০০৬ সালের মে মাসে । বর্তমানে অবস্থাটা অনেকটাই পালটেছে । তখন ইন্টারনেটে বাংলার পাঠক সংখ্যা খুবই কম ছিল আর ব্লগার তো ছিল আরো কম । এখন উইনডোজ ভিস্তা আর সেভেন এ কোনো কনফিগারেশন ছাড়াই ভাল বাংলা পড়া যায় আর অভ্র কিবোর্ড এবং ইউনিকোড বাংলা সম্পর্কে মানুষ আরো বেশি করে জেনেছেন । তাই শুধু বাংলাদেশ নয় । ভারত থেকেও বাংলা ব্লগারের সংখ্যা বাড়ছে । আর কিছু দিনের মধ্যে যে ভারতীয় বাংলা ব্লগারের সংখ্যা আরো বাড়বে তাতে কোন সন্দেহ নেই ।

এই ব্লগ আমি ছদ্মনামে শুরু করেছিলাম কারন সেই সময় ভেবেছিলাম যে এখানে নানা রকম বির্তকিত বিষয় নিয়ে লিখব ।
অনলাইনে নিজের আসল নামকে যতটা সম্ভব কোনো রকম বিতর্ক থেকে দূরে রাখাই ভালো। বেশ কিছু বিষয় নিয়ে লিখেওছিলাম । এর মধ্যে লেখার পরিমান কমে গেলেও এটা মনে করার কোনো কারন নেই যে আমি বাংলায় ব্লগিং ছেড়ে দিয়েছি । আমি লিখব কারন লিখতে হবে বাংলায় ।

Wednesday, October 31, 2007

কলকাতার দুর্গাপুজো


বহু বছর ধরেই কলকাতার দুর্গাপুজো দেখে আসছি । এবারও দেখলাম । আমি কলকাতার বাইরের বাসিন্দা হলেও কলকাতা আমার কাছে নিজের ঘরের মতই কারণ আমার আমার মামার বাড়ি ও দিদির বাড়ি সহ আরও বহু আত্মীয়ের বাস কলকাতাতেই তাই পুজোর দিনগুলোতে এখানে ঘাঁটি গাড়তে কোন অসুবিধা হয় না ।

পুজোর দিনগুলোতে কলকাতা যেন এক অন্য চেহারা নেয় । এমনিতে কলকাতা রাতজাগা শহর নয় । রাত দশটা বাজলেই শহরের বহু এলাকা একেবারে ফাঁকা হয়ে যায় । কিন্তু পুজোর দিনগুলোতে সারা রাত্রি শহর জেগে থাকে । বাস ও মেট্রোরেল চলে ।

কলকাতার পুজো গুলোকে এখন মোটামুটি চারভাগে ভাগ করা যায় । প্রথম হল পুরনো জমিদার ও বনেদী বংশের পুজোগুলি । যারা শত অসুবিধার মধ্যেও নিজেদের পুজো বজায় রাখতে পেরেছে । যেমন শোভাবাজার রাজবাড়ির পুজো বা লাটুবাবু ছাতুবাবুর বাড়ির পুজো ।

দ্বিতীয় হল সার্বজনীন পুজো । অর্থাৎ ক্লাব বা পাড়ার পুজো । সার্বজনীন পুজোগুলি আবার দুভাগে বিভক্ত । একদল চিরাচরিত ধরনের মন্ডপ এবং প্রতিমা তৈরি করেন যেমন বাগবাজার সার্বজনীন বা ম্যাডক্স স্কোয়ারের পুজো । এছাড়াও আরো বহু সার্বজনীন পুজোই এই গোত্রের মধ্যে পড়বে ।

দ্বিতীয় প্রকারের সার্বজনীন পুজোগুলিকে বলা যেতে পারে থিম পুজো ।যে ধরনের পুজোর এখন কলকাতায় রমরমা । থিম পুজোর বৈশিষ্ট্য হল প্রত্যেক বার মণ্ডপ এবং প্রতিমার চেহারা আলাদা আলাদা রকমের হয় । কোন একটি বিশেষ থিম বেছে নেওয়া হয় প্রতিমা এবং মণ্ডপসজ্জার জন্য । এই থিম যেকোন রকমেরই হতে পারে । যেমন এবারেই যে থিমগুলি দেখা গেছে সেগুলি হল বাংলার গ্রাম এবং নবান্ন, আফ্রিকার আদিবাসী গ্রাম, রাজস্থানের দুর্গ, দক্ষিন ভারতীয় মন্দির, পুরনো ভাঙা মন্দির, নোয়ার জলযান প্রভৃতি । অন্যান্য বছরে আরো রোমাঞ্চকর কিছু থিমের মধ্যে ছিল মঙ্গলগ্রহ, ট্রেন অ্যাক্সিডেন্ট প্রভৃতি ।

সার্বজনীন পুজোগুলি ছাড়া এখন কলকাতায় যে পুজোগুলি সংখ্যায় বাড়ছে সেগুলি হল ফ্ল্যাটবাড়ির পুজো ।

দিনে দিনে কলকাতার পুজোর বাজেট আরোও বাড়ছে এবং ছোটখাটো অল্প বাজেটের পুজোগুলিও আস্তে আস্তে বড় বাজেটের হয়ে উঠছে । কলকাতার বেশিরভাগ বড় বড় পুজোই আর বাড়ি বাড়ি গিয়ে চাঁদা তুলে হয় না । তার বদলে এখন বড় কম্পানিগুলি বেশির ভাগ টাকা স্পনসর করে । কলকাতায় বিজ্ঞাপন করার সের সময় হল পুজোর সময় আর কম্পানিগুলি সেটা ভালোই বোঝে । যেমন এবার খুব বড়ভাবে হাজির ছিল ভোডাফোন কম্পানি। এই কম্পানিটি কলকাতায় এসেছে মোবাইল কম্পানি হাচকে কিনে নেবার মাধ্যমে । তাই পুজোর সময়কে তারা বেছে নিয়েছিল কলকাতায় নিজেদের ব্রান্ড আর লোগো কে সাধারন মানুষের কাছে পরিচয় করানোর জন্য । এইজন্য বেশির ভাগ পুজোমন্ডপে তাদের বিজ্ঞাপন দেখা গেছে ।

বিভিন্ন রাজনৈতিক এবং প্রভাবশালী নেতাও তাদের শক্তি পরীক্ষা করে নেয় বড় বাজেটের পুজো করানোর মাধ্যমে । অনেক সময় তাদের নাম পুজো কমিটির কোথাও থাকে না কিন্তু সবাই জানে যে এটা অমুকদার পুজো ।

কলকাতা এই কয়েকটা দিন বলা যেতে পারে যে একটি বিশাল শিল্প প্রদর্শনীতে পরিণত হয় । সাধারনলোকে খুব কমই কলকাতায় শিল্পপ্রদর্শনী দেখতে যায় বিভিন্ন গ্যালারিতে কিন্তু পুজোর সময়ে খুব সহজেই শিল্পীরা সাধারন মানুষের কাছে পৌঁছতে পারেন । এছাড়া বিভিন্ন থিমের পুজোর মাধ্যমে বিভিন্ন সংস্কৃতির সঙ্গে পরিচয় করা যায় । যাদের পক্ষে রাজস্থানে বা দক্ষিন ভারতে গিয়ে বিখ্যাত স্থাপত্যগুলি দেখে আসা সম্ভব নয় তারাও অন্তত কিছুটা ধারনা পেতে পারে সেই আদলে তৈরি মন্ডপগুলি দেখে ।এছাড়া বহু অজানা শিল্প ও সংস্কৃতির সাথেও পরিচয় করা যায় এই সময়ে ।

কলকাতার পুজোর আরো একটি বৈশিষ্ট্য হচ্ছে আলোকসজ্জা । মূলত চন্দননগরের আলোকশিল্পীরাই মূলত আলোকসজ্জাগুলি তৈরি করে থাকেন । সমসাময়িক বিভিন্ন ঘটনা উঠে আসে আলোকসজ্জার মাধ্যমে ।

পুজো তো চলে গেল আর অনেকের পক্ষেই কলকাতায় এসে পুজো দেখা সম্ভব নয় । তবে এবছর ডিজিট্যাল ক্যামেরার দাম কমায় আর ইন্টারনেটের প্রসার আরো বৃদ্ধি পাওয়ায় প্রচুর ছবি ইন্টারনেটে আপলোড করা হয়েছে । তাই পিকাসা বা ফ্লিকারে গিয়ে Durga Puja 2007 লিখে সার্চ করলেই আপনি কলকাতার পুজোর অনেক ভালো ভালো ছবি দেখতে পাবেন ।

Sunday, March 11, 2007

চাকরি ছাড়ার ইতিবৃত্ত

কিছু কিছু অফিসে পরিস্থিতি হচ্ছে এরকম যে দলে দলে কর্মীরা আসছে আর যাচ্ছে । অর্থাৎ কর্মীদের চাকরি ছেড়ে দেবার হার প্রচুর । অনেক সময়ে মাত্র তিনমাসের ব্যবধানে দেখা যায় অফিসে সব নতুন মুখ । অফিসের চেহারাই যেন পালটে গেছে । আবার তিনমাস পরে গেলেই দেখা যায় যে আবার বহুলোক ছেড়ে দিয়েছে এবং অন্যরা যোগ দিয়েছে ।

কিন্তু বেসরকারী চাকরিতে ছেড়ে দেবার এত বেশী হার কেন । ম্যানেজমেন্ট অনেক সময়েই দোষ চাপায় কর্মীদের উপরে । তাদের বক্তব্য হচ্ছে যে সামান্য কিছু টাকা বেশি পাবার লোভে কর্মীরা চাকরি ছেড়ে চলে যাচ্ছে । কিন্তু আমার মনে হয় ব্যাপারটা এত সহজ সরল নয় । বেশিরভাগ কর্মীই শুধুমাত্র কিছু টাকা বেশি পাবে বলে চাকরি বদলায় না । চাকরি বদলানোর পিছনে বেশ কিছু অন্য কারনও কাজ করে ।

আমি গত প্রায় আড়াই বছর ধরে কলকাতায় বেসরকারি চাকরি করছি । বর্তমানে আমি আমার পঞ্চম চাকরি করছি । কোনও অফিসে আমার সর্বাধিক থাকার রেকর্ড হল মাত্র নয় মাস । এরকম ব্যাপার শুধু আমার ক্ষেত্রে নয় আরও বহু জনের ক্ষেত্রেও দেখা যাচ্ছে । কোন অফিসে কেউ যদি দুই বছর কাটায় তাহলেই সবাই অবাক হয়ে যায় যে কি করে সে দুই বছর একই কম্পানিতে কাটিয়ে দিল । মোটামুটি ভাবে চাকরি ছাড়ার পিছনে কারনগুলো যদি খোঁজার চেষ্টা করি তাহলে সেগুলো দাঁড়াবে এরকম --

১. ইন্টারভিউয়ের সময়ে ম্যানেজমেন্ট যা বলে পরে দেখা যায় সেগুলো অনেক কিছুই মিলছে না । যেমন বলা হল আমাদের অফিস সন্ধ্যে ছ’টায় ছুটি । কিন্তু কয়েকদিন যেতে না যেতেই দেখা গেল যে ছুটির টাইমটা আসলে সাতটা ছাড়িয়ে আটটা সাড়ে আটটায় গিয়ে পৌঁছচ্ছে । কিংবা ইন্টারভিউয়ের সময়ে বলা হয়েছিল আপনাকে এই ধরনের কাজ করতে হবে । কিন্তু কার্যক্ষেত্রে দেখা গেল তার বাইরেও আরো অনেক ধরনের কাজ দেওয়া হতে লাগল যেটা তার করার কথা ছিল না । অর্থাৎ স্পষ্টই বোঝা গেল যে ইন্টারভিউয়ের সময়ে ম্যানেজমেন্ট তথ্য গোপন করেছিল ।

২. উৎসাহের অভাব চাকরি ছাড়ার ক্ষেত্রে একটা প্রধান কারন বলে মনে হয় । অর্থাৎ কারও কর্মকুশলতার অভাব হলে ম্যানেজমেন্ট স্টেপ নেবে কিন্তু কেউ যদি ভালো কাজ করে তবে তার জন্য কোন ধন্যবাদ বা উৎসাহ দেবে না । ভাব খানা হল এই যে মাইনে দিচ্ছি এই ঢের আবার ধন্যবাদ দিতে হবে নাকি ।

৩. কাজের পরিকল্পনার অভাব যার ফল ভুগতে হয় কর্মীদের । অর্থাৎ ম্যানেজমেন্ট কাজ ধরেই খালাস । কিন্তু সেই কাজটা কিভাবে সুষ্ঠুভাবে করা যেতে পারে সে বিষয়ে কোন চিন্তাভাবনা নেই । ফলে তিন দিনের কাজ শেষ হতে লাগছে আটদিন আর দায় গিয়ে পড়ছে কর্মীদের উপর ।

৪. ম্যানেজমেন্টের সঙ্গে কর্মীদের যোগাযোগের অভাব । যার ফলে কর্মীরা বুঝতে পারছে না তাদের সঠিক দায়িত্বটা কি । আর ম্যানেজমেন্ট বুঝতে পারছে না যে কর্মীদের কাজ করতে কি সমস্যা হচ্ছে ।

৫. পরিকাঠামোর অভাব । কর্মীদের কাজ করার উপযুক্ত পরিকাঠামো নেই অথচ তাদের বলা হচ্ছে ঠিক সময়ে সঠিক ভাবে কাজ শেষ করতে । অর্থাৎ ঢাল নেই তরোয়াল নেই নিধিরাম সর্দার ।

৬. ম্যানেজমেন্টের জ্ঞান এবং দক্ষতার অভাব । অনেক ক্ষেত্রেই দেখা যায় যে অফিসে যে ধরনের কাজ হয় সে ব্যাপারে অফিসের মালিকপক্ষ বা ম্যানেজমেন্টের কোন জ্ঞান নেই । তার শুধু টাকা ইনভেস্ট করেই খালাস । ফলে কোন কাজে কোন সমস্যা দেখা দিলে তাদের সেই সমস্যা বোঝার দক্ষতা বা ধৈর্য কোনটাই নেই । তাদের খালি টাকায় ইন্টারেস্ট ।

৭. কোন ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা নেই । অর্থাৎ অফিস যেমন চলছে চলুক । এর থেকে আর বেশি বাড়াব না । যেরকম কাজ করছি সেই রকম কাজই করে যাব, নতুন কোন কাজের চেষ্টা করব না । কর্মীদের যদি অন্যান্য কাজে দক্ষতাও থাকে তাহলেও সেই দক্ষতাকে কাজে লাগাব না ।

৮. খারাপ ব্যবহার । এটা করে অফিসের ম্যানেজমেন্ট নিজেরাই নিজেদের সর্বনাশ করে । কর্মীরা সেই অবস্থায় কিছু না বললেও পরে এর শোধ ঠিকই নেয় । চাকরি ছাড়ে ঠিক মোক্ষম সময়ে । যার ফলে কোন প্রজেক্ট ডুবে যায় এবং মালিকপক্ষের সাড়ে সর্বনাশ হয় ।

৯. অবাস্তব টার্গেট বা ডেডলাইন দেওয়া । অনেক সময়েই ম্যানেজমেন্ট জেনেশুনেই কর্মীদের উপরে অবাস্তব টার্গেট বা ডেডলাইন চাপিয়ে দেয় । এবং এব্যাপারে তারা কর্মীদের সাথে কোন আলোচনাও করে না ।

১০. মাইনে বাড়ানোর কোনো ইচ্ছা না থাকা । ম্যানেজমেন্ট মৌখিকভাবে কর্মীদের কাজের খুব প্রশংসা করে কিন্তু মাইনে বাড়ানোর কথা উঠলেই চুপচাপ হয়ে যায় । কর্মীদের এই শুকনো প্রশংসায় যে মন ভরবে না সেটাই তো স্বাভাবিক ।

কোন ভুলভাল অফিসে ম্যানেজমেন্টের ব্যবহার কিরকম হয় তা নিজের দেখা একটা ঘটনা বলি ।

একটা অফিসে আমি গ্রাফিক ডিজাইনার হিসাবে কাজ করতাম । সেখানে একজন প্রজেক্ট ম্যানেজারের আন্ডারে দুজন প্রোগ্রামার কাজ করত । আমরা একই ঘরে বসতাম । সেই ম্যানেজার একজন প্রোগ্রামারকে জিজ্ঞাসা করল কিরে তোর কাজ হল ? ছেলেটি বলল না এখনও হয়নি । কি এখনও হয়নি ! খেঁকিয়ে উঠল ম্যানেজার । আর কবে হবে ?

খানিকক্ষন বাদে প্রজেক্ট ম্যানেজার আবার জিজ্ঞাসা করল কিরে হল ? এবার ছেলেটি বলল হ্যাঁ হয়ে গেছে । প্রজেক্ট ম্যানেজার এবারও খেঁকিয়ে উঠল । সেকি ! হয়ে গেছে ! তবে এখনও চুপ করে বসে আছিস কেন ?

ছেলেটি কয়েকদিন বাদে থেকেই অফিসে আসা বন্ধ করল । এবং বহু চেষ্টা করেও সেই প্রজেক্ট ম্যানেজার তার সাথে আর যোগাযোগ করতে পারল না ।

তবে চাকরি ছাড়ার ক্ষেত্রে সব দোষই যে ম্যানজমেন্টের এমন আমি মনে করি না । অনেক ক্ষেত্রে কর্মীদেরও দায়িত্ব থাকে । শুধুমাত্র ভাল লাগছে না বলে চাকরি ছেড়ে দিতেও আমি দেখেছি ।

তবে কর্মীদের দায়িত্ব থাকে যেমন কম্পানিকে স্যাটিসফাই করা তেমনি কম্পানিরও দায়িত্ব কর্মীদের চাহিদা মেটানো । যদি কোন কর্মী মনে করে যে তার কম্পানি তাকে তার যোগ্যতা অনুযায়ী মাইনে দিচ্ছে না তবে সে তো অন্য কোন জায়গায় জয়েন করতেই পারে । এর মধ্যে তো দোষের কিছু নেই । তবে তার নির্দিষ্ট সময়ের নোটিশ দিয়ে তবেই ছাড়া উচিত । যাতে কোন পক্ষেরই কোনো অসুবিধা না হয় ।

আমার মাত্র আড়াই বছরের অভিজ্ঞতার উপরে আমি এই লেখা লিখলাম । হয়ত সময়ের সাথে সাথে আমার দৃষ্টিভঙ্গিও কিছুটা পালটাতে পারে । আর সব সংস্থায় যে এরকম অবস্থা তা মনে করার কোন কারন নেই । অনেক অফিসেই সুন্দর ব্যবস্থা নীতি এবং পরিকল্পনা থাকে । কিন্তু দুর্ভাগ্যবশত আমার কেরিয়ারের শুরুর সংস্থাগুলোতে আমাকে এই রকম সমস্যার সম্মুখীন হতে হয়েছিল ।

Wednesday, March 07, 2007

স্যার কালচার

অনেক অফিসেই দেখা যায় যে একটা ছোট ঘরে অন্য সবার থেকে বিচ্ছিন্ন অবস্থায় হুমদো মুখে একজন বসে থাকে তাকে সবাই স্যার স্যার করে ।

কলকাতায় এই স্যার কালচারটা বেশ প্রবল । অফিসে বসকে সবাই স্যার বলেই ডাকে । আর অনেক উল্লুক এইভাবে স্যার স্যার ডাকাটাকে বেশ পছন্দও করে । যেন স্যার কি যেন একটা বিশাল সম্মানের ডাক ।

আমি কখনই কাউকে স্যার বলে ডাকাটা পছন্দ করি না । আসলে স্কুলের মাস্টারমশাইদের ছাড়া কাউকেই আমার স্যার বলতে ইচ্ছা করে না । তবুও চাকরিতে জয়েন করার পরে যখন দেখি যে সবাই বসকে স্যার স্যার করছে তখন বাধ্য হয়ে আমাকেও করতে হয় । তবে আমার চাকরি জীবনে সব বসকেই যে স্যার স্যার করতে হয়েছে এমন নয় । দুটি অফিসে আমরা বসকে অমুকদা তমুকদা সম্বোধনেও ডাকতাম । যেটা আমার মতে খুবই ভালো ।

অফিসের বাইরে লোকে দুঅবস্থাতে স্যার স্যার করে । যখন তারা বিনা টিকিটে চেকারের হাতে ধরা পড়ে অথবা কোন কারনে পুলিশের হাতে পড়ে । আবার অনেক স্কুলের ক্লার্ক খুব অসন্তুষ্ট হয় যদি ছাত্ররা তাকে স্যার বলে না ডাকে ।

তবে স্যার বলে আমাকেও কেউ ডেকেছে এমনও হয়েছে । কলকাতার রাস্তায় কিছু ভিখিরি পাওয়া যায় যারা স্যার স্যার বলে আলাপ ফাঁদে তারপর আসল কথায় আসে । স্যার একটা কথা ছিল । আমি বলি কি কথা ? সে তখন ইনিয়ে বিনিয়ে আসল কথায় আসে যে সে টাকা চায় কারন সে খুব বিপদে পড়েছে ইত্যাদি ইত্যাদি ।

আমি অল্প কিছুদিন একটা কম্পিউটার সেন্টারে ফ্যাকাল্টির কাজ করেছিলাম তখন সেখানে ছাত্রছাত্রীরা আমাকে স্যার স্যার বলেই ডাকত । তবে সেটা শুনতে আমার কখনই ভালো লাগত না ।

আমার একটা প্রস্তাব আছে । এই স্যার কথাটাকে কি আমাদের কর্মজীবন থেকে একেবারেই বাদ দেওয়া যায় । এটা শুধুমাত্র আমাদের ছাত্রজীবনেই সীমাবদ্ধ থাকুক না ।

Friday, February 16, 2007

আমার নতুন এমপিথ্রি প্লেয়ার

কয়েকদিন আগেই কিনেছি আমার নতুন ট্রানসেন্ড টি সোনিক ৬১০ এমপিথ্রী প্লেয়ার । (Transcend T.Sonic 610) বেশ কিছুদিন ধরেই আমার একটি ছোট এমপিথ্রি প্লেয়ার কেনার ইচ্ছা ছিল কিন্তু বাজেট বেশি ছিল না ।

যাই হোক শেষ অবধি ২৫০০ টাকা দিয়ে কলকাতার চাঁদনি চকের একটি দোকান থেকে কিনেই ফেললাম এটা ।

প্রায় একসপ্তাহ ধরে নিয়মিত শুনছি । অফিস যাবার পথে ট্রেনে নিয়মিত শোনা হচ্ছে । এটা এমপিথ্রি এবং ডবলুএমএ সাপোর্ট করে । এছাড়া এটা দিয়ে এফএমও শোনা যায় । এটির হেডফোনের জ্যাকে যেকোন স্পিকারের জ্যাকও ঢুকিয়ে স্পিকার দিয়েও ভাল গান শোনা যায় ।

সেটটার সাউন্ড কোয়ালিটি ভাল । এফএমও ভাল ধরে । ব্যাটারিটাও মোটামুটি ভাল । একবার চার্জ দিলে চোদ্দ ঘন্টা শোনার কথা বলা থাকলেও মোটামুটি দশ থেকে বারো ঘন্টা শোনা যেতে পারে । সেটটি দিয়ে কোন শব্দ রেকর্ডও করা যাবে আবার এফএম থেকেও রেকর্ডিং করা যাবে ।

সেটটির ডিসপ্লেটাও বেশ সুন্দর । আর নেভিগেশনটাও খুব সহজ । সহজেই কোন ফোল্ডারের ভিতরে আর বাইরে যাওয়া যায় ।

সেটটির ক্যাপাসিটি হল এক জিবি । এটার একটা অসুবিধা হল যে এটা কেবলমাত্র কম্পিউটারের ইউএসবি পোর্টের মাধ্যমেই চার্জ দেওয়া যায় । তাই যদি হাতের কাছে কোন কম্পিউটার না থাকে তবে চার্জ দেওয়া যাবে না । তবে আশার কথা এই বাজারে এসি টু ইউএসবি চার্জার পাওয়া যায় প্রায় চারশো টাকা দাম, সেটা একটা কিনে নিলে এটাকে সেই চার্জার দিয়ে সরাসরি যেকোন সাধারন এসি প্লাগ থেকেই চার্জ দেওয়া যাবে । সেটটির উপর দুই বছরের গ্যারান্টি রয়েছে তবে ব্যাটারির উপরে গ্যারান্টি ছয় মাসের ।

সেটটির আকার বেশ ছোট সহজেই পকেটে ঢুকে যায় । আর ওজন মাত্র আঠাশ গ্রাম । তাই সবদিক থেকে বিচার করলে যে দামে এটা পাওয়া যাচ্ছে সে অনুপাতে এটাকে বেশ ভালো বলেই মনে হয় ।

Thursday, February 08, 2007

অফিসে শেষ দিন

আজই ছিল আমার বর্তমান অফিসে শেষ দিন । কাল থেকে অন্য অফিসে জয়েন করছি । যেখানে জয়েন করছি সেখানে এখনকার অফিসের থেকে দ্বিগুনেরও বেশী মাইনেতে জয়েন করছি । অফিসের কাজের মান এবং পরিকাঠামো অনেক ভালো ।

তবুও এই অফিস ছেড়ে যেতে একটু কষ্টই হচ্ছে । খুব বেশী দিন কাজ করিনি এই অফিসে তবুও সহকর্মীদের সাথে সম্পর্ক খুব ভালো হয়ে গিয়েছিল । তাদের ব্যবহার ছিল অনেক সহজ সরল এবং আন্তরিক। খুবই কম দিন কাজ করেছি এই অফিসে । ছয় মাসেরও কম সময় । এবং অফিস পরিবর্তন করাও আমার কাছে নতুন কিছু নয় । সব মিলিয়ে এখনও অবধি আমি চারটি অফিসে কাজ করেছি । কালকের নতুন অফিস হল পঞ্চম ।

আজ আমার সহকর্মীরা আমাকে লাঞ্চ খাওয়াল এবং আমাকে একটি ইলেকট্রনিক ঘড়ি উপহার দিল স্মৃতি হিসাবে ।

নতুন অফিসে অনেক নতুন দায়িত্ব থাকবে নতুন পরিবেশে নতুন মানুষদের সাথে পরিচয় হবে। হয়তো এখানেও সবার সাথে সুন্দর সম্পর্ক গড়ে উঠবে । তবুও মাঝেমধ্যেই মনে পড়বে পুরনো অফিসের কথা ।

Saturday, December 02, 2006

একটি বনধের দিন...

গত পরশু যখন তৃণমূল বনধ্ ডেকেছিল তখনই ঠিক করে নিয়েছিলাম যে যেভাবেই হোক অফিসে আসবই । কারণ গত বনধে অফিসে না যাওয়ার জন্য আমার মাইনে কাটা গিয়েছিল । তাই গতকাল সকাল বেলা অফিসে যাওয়ার জন্য বাড়ি থেকে বেড়িয়ে পড়লাম । স্টেশনে গিয়ে দেখলাম একটা ট্রেন দাঁড়িয়ে আছে । বেশ ফাঁকা । তাতেই উঠে পড়লাম । অন্যদিনের মতো ঝোলাঝুলি ভিড় নেই । যারা ট্রেনে উঠেছে তাদের বেশ খুশির মেজাজ । কয়েকটা স্টেশনে খানিকক্ষন করে দাঁড়ালেও মোটামুটি টাইমেই বিধাননগর স্টেশনে নেমে পড়লাম ।


রাস্তায় বেড়িয়ে দেখলাম বাস খুব কম চলছে । কিছু অটো চলছে । রাস্তাঘাট বেশ ফাঁকা । অফিসে পৌঁছে দেখলাম মাত্র তিনজন এসেছি । আর প্রোডাকশনের আমি ছাড়া আর কেউই আসে নি । খানিকক্ষন বসে থাকার পরে প্রোডাকশনে ঢুকে আমার কম্পিউটার টা চালালাম । খানিকক্ষন সামান্য কাজ করলাম । আর গান শুনলাম । এইভাবেই টিফিনের সময় হয়ে গেল । টিফিন করার পরই অফিস ছুটি হয়ে গেল । আমি বাড়ির দিকে রওনা দিলাম । আবার বিধাননগর স্টেশনে আসার সাথে সাথেই ট্রেন পেয়ে গেলাম । একেবারে ফাঁকা । ট্রেনটা খুব ভালো ভাবেই এসে পৌছাল । যখন বাড়িতে পৌছলাম তখন সময় বেলা দুটো কুড়ি । তারপর একটা দারুণ দিবানিদ্রা দেওয়া গেল ।

Tuesday, November 21, 2006

আমার অফিস যাওয়ার রাস্তা

দিন চলে যায় দিনের মত । আমি রোজ লোকাল ট্রেনে ডেলি প্যাসেঞ্জারি করি । রোজ সকালে ফাঁকা ট্রেন ছেড়ে দিয়ে ভিড় ট্রেন ধরি । ব্যাগ কাঁধে নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকি একা, আজও ট্রেনে আমার কোন বন্ধু হল না ।

দমদম স্টেশনে ভিড় একটু ফাঁকা হলে গেটের কাছে এসে দাঁড়াই । বিধাননগর আসতেই নেমে পড়ি, বলা ভালো পিছনের ভিড় আমাকে ঠেলে নামিয়ে দেয় ।

রোজই চোখ তুলে বিধাননগর স্টেশনের গায়ে তৈরি হওয়া বিরাট ফ্ল্যাটবাড়িটার দিকে একবার চেয়ে দেখি । কি বিরাট ! স্টেশনের একদিক পুরো ঢেকে গেছে । কিছু লোক লাইনের উপর দিয়েই চলতে আরম্ভ করে আর রেল লাইনের পাশে গিয়ে হিসি করতে শুরু করে । এটাই কলকাতা । এখানে এসবে কেউ বিরক্ত বা উত্তেজিত হয় না । লাইনের উপর দিয়ে চলতে গিয়ে বিধাননগর স্টেশনে কত লোক মরেছে । কিন্তু তবুও লাইনের উপর দিয়ে পারাপারের বিরাম নেই ।

স্টেশন থেকে বেরিয়ে হেঁটেই অফিস যাই । চারিদিকে ধোঁয়া ধুলো আর ময়লা । বিবর্ণ সমস্ত বাস, ট্যাক্সি আর অটো ধোঁয়া ছাড়তে ছাড়তে চলেছে । লোকজন দৌড়াচ্ছে তাতে চড়বে বলে । ফুটপাত ভাঙাচোরা, তার আবার বেশির ভাগ অংশ দখল করে আছে দোকানদাররা । নোঙরার মধ্যেই চলছে রান্না বান্না খাওয়াদাওয়া । চারিদিকে মাছি উড়ছে । গাছের পাতাগুলোও ধুলো পড়া । চায়ের দোকানে ভিড়, হাতে খবরের কাগজ। এরা কি কোনদিন অফিসে যায় না ? গামছা পরা লোক খালি গায়ে, হাতে মোবাইল, ছোট ট্রাকে করে এসেছে মুরগী ভর্তি কন্টেনার, রাস্তার উপর পড়ে আছে একটা মরা মুরগী।

বাচ্চারা মা অথবা কাজের মেয়ের হাত ধরে স্কুল থেকে বাড়ির দিকে চলেছে আর আমি চলেছি অফিসে । মাল আনার ভ্যানরিকশাগুলো রাস্তার উপরেই রাখা । ফুটপাতের উপর কেরোসিন বিক্রি হচ্ছে । কোথাও আবার বেদী করে মন্দির । ধর্মবিশ্বাসী লোকের অভাব নেই এখানে । কোথাও আবার দলবদ্ধভাবে তাস খেলা চলেছে । কেউ বা দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে রাস্তার পাশের বোর্ডে টাঙানো গণশক্তি পড়ছে । রাস্তার পাশের দোকানের পিসিও বুথে মিকি মাউসের ছবি । কোথাও বা বসে আছে একটি সুন্দরী কিন্তু হতাশ এক তরুণী । সুন্দর সকাল সন্ধ্যা গুলো বোধহয় তার দোকানে বসেই কাটে । রাস্তার ধারের সাইনবোর্ডে মাইকেল মধূসুদনের ছবি । ফুটপাতে ঘুমন্ত কুকুর । এই নিয়েই আমার অফিসে যাবার রাস্তা ।

অবশেষে বড় রাস্তা থেকে আমি বাঁক নিই ডানদিকে এক সরু গলির ভিতরে । বড় রাস্তার বিরাট আওয়াজ কোলাহল অনেক কমে আসে । ডান দিকে বাঁদিকে গেরস্ত বাড়ি । বাঁদিকে একটা ঘরে তালাবন্দী কোন দেবতা । অনেকেই দেখি দরজা ছুঁয়ে প্রণাম করে যায় । আরো খানিকটা যাবার পর অবশেষে আমি অফিসের দরজায় এসে হাজির হই । এটা কোন অফিস পাড়া নয় । তবু এখানেই আমার অফিস । এখানেই নয় ঘন্টা কাটানোর পরে আমাকে আবার ফিরতে হবে সেই একই রাস্তা দিয়ে । তবে সেটা আলাদা এক গল্প ।

Thursday, October 26, 2006

রেডিও ও আমি


আমাদের ছোটবেলায় রেডিও ছিল বিনোদনের একমাত্র মাধ্যম । বেশিরভাগ বাঙালি বাড়িতেই রোজ সন্ধেবেলা রেডিওতে খবর ও নাটক শোনা ছিল জরুরী বিষয় । কিন্তু তখন রেডিও ছিল আমার নাগালের বাইরে ।

যখন আমি রেডিও নিয়ে নাড়াচাড়া করি তখন আমাদের বাড়িতে টিভি ভালই জাঁকিয়ে বসেছে । কিন্তু তবুও আমি রেডিও শুনতাম । আমার বাবা-মার বিয়ের পুরনো রেডিওতে আমি বিবিধ ভারতী, যুববাণী আর বিভিন্ন শর্টওয়েভ চ্যানেল শুনতাম ।

শর্টওয়েভে বিবিসি, ভয়েস অফ আমেরিকা প্রভৃতি স্টেশন শুনে বেশ একটা আর্ন্তজাতিক অনুভূতি হত । এছাড়াও নানা অচেনা জায়গার এবং অচেনা ভাষার স্টেশন শুনে বুঝতে চেষ্টা করতাম যে সেটা কোথাকার স্টেশন । পৃথিবীর বহুদেশই বাংলায় অনুষ্ঠান প্রচার করত নিয়মিত ভাবে । সম্ভবত এখনও করে ।

আমি মাধ্যমিক পাস করার পর নিজের মিউজিক সিস্টেম কিনি । তাতে ক্যাসেট চালিয়ে গান শোনা যেত এবং রেডিও শোনা যেত । এই সিস্টেমটা কেনার পর প্রথম আমি কলকাতার এফএম স্টেশন শুনতে পাই । কারণ এর আগের বাড়ির পুরনো রেডিওগুলোতে এফএম ছিল না ।

মিডিয়াম ওয়েভ এবং শর্টওয়েভের থেকে এফএম এর সাউন্ড কোয়ালিটি অনেক ভাল । তখন অবশ্য কলকাতায় একটিই এফএম স্টেশন ছিল । তা ছিল আকাশবাণীর । এই এফএম স্টেশনের জনপ্রিয়তা খুবই বেশী ছিল । বহু বাড়ী, দোকানে সবসময় এফএম চলত । অনেকে রেডিও না কিনে শুধুমাত্র একটা বক্স কিনে নিত আর তার সাথে একটা এফএম রিসিভার লাগিয়ে নিত । এগুলোতে এফএম ছাড়া অন্য কিছু শোনা যেত না ।

আকাশবাণীর এফএমের বিরুদ্ধে অভিযোগ ছিল যে গানের থেকে বকবকানি বেশি হয় । বাস্তবিকই অনেক সময়ে দেখা যেত সঞ্চালক সঞ্চালিকাদের বকর বকর এবং জ্ঞান বিতরন গানের থেকে অনেক বেশী সময় ধরে হচ্ছে । এছাড়া এই স্টেশনে বেশিরভাগ সময়েই শুধু পুরনো গান শোনান হত । নতুন গান খুব কম শোনানো হত । ফলে অল্পবয়সীদের মধ্যে এই এফএমএর জনপ্রিয়তা খুব একটা বেশী হয় নি । আকাশবাণীর এই স্টেশনে ফোন করে অনেকে নানা বিষয়ে নিজের মতামত জানাতেন । প্রায়ই দেখা যেত যে একই লোক রোজই ফোনের লাইন পাচ্ছেন আর বহু লোক অভিযোগ করতেন যে তাঁরা বহুবার চেষ্টা করেও একবারও লাইন পাচ্ছেন না । এটা একটা রহস্যজনক ব্যাপার ছিল যে একই লোক কিভাবে বার বার ফোনের লাইন পায় । এই ব্যাপার কুখ্যাত ছিল মধ্যমগ্রাম এলাকা । দেখা যেত যে মধ্যমগ্রামের লোকেরা খুব সহজেই এফএমের ফোনের লাইন পায় । এর মধ্যে বিখ্যাত ছিলেন ভুলু সাহা এবং নান্টু সাহা । এফএমে ফোন করে করে ভুলু সাহা প্রায় বিখ্যাত লোক হয়ে পড়েছিলেন । যেকোন লোক একডাকে ভুলু সাহাকে চিনত ।

এরমধ্যে অবশ্য শর্টওয়েভ রেডিও মাঝে মাঝে শুনতাম । কারগিল যুদ্ধের সময় শর্টওয়েভ রেডিওতে পাকিস্তানের প্রোগ্রাম শুনে হাসি পেত । যেকোন উপায়ে ভারতের নিন্দে করাই যেন পাকিস্তান রেডিওর একমাত্র উদ্দেশ্য । যেমন গানের প্রোগ্রামে একটি করে গান শোনানো হত এবং সঞ্চালিকা খানিকক্ষন ভারতের পিণ্ডি চটকাতেন । তারপর আবার একটা গান । নানা ভাবে নানা উপায়ে ভারতের বিরুদ্ধে বিষোদ্গার করার জন্যই যেন স্টেশনটি খোলা হয়েছে । খুব রাগ হত যখন সঞ্চালিকা উগ্রপন্থীদের শহীদ আর ভারতের বীর জওয়ানদের দুশমন বলতেন ।

২০০১ সালে নিউইয়র্কের টুইন টাওয়ার ধ্বংসের পরে যখন আমেরিকা আফগানিস্তান আক্রমন করে তখন যুদ্ধ লাগার প্রথম খবর আমি শর্টওয়েভ রেডিও থেকেই পেয়েছিলাম ।

এরমধ্যেই একবার খবরের কাগজে পড়লাম যে সরকার প্রাইভেট এফএম স্টেশনের লাইসেন্স মঞ্জুর করেছে । তখন থেকে আরম্ভ হল আমার প্রতীক্ষা । লাইসেন্স দেবার বহু দিন পরে প্রায় বছর দুয়েক হবে কলকাতায় একই সঙ্গে একই দিনে চারটি নতুন চব্বিশ ঘন্টার প্রাইভেট এফএম স্টেশন চালু হল । বলা যায় কলকাতায় রেডিওর পুর্নজন্ম হল ।

এই চারটি স্টেশন হল আমার এফএম, রেডিও মির্চি, রেড এফএম এবং পাওয়ার এফএম । চারটি চ্যানেলে একদম নতুন গান চব্বিশ ঘন্টা ধরে শোনান হতে লাগল । কলকাতার রাস্তায় পঞ্চাশ টাকা করে ঝুড়ি করে এফএম রেডিও বিক্রি হতে লাগল ।

এই নতুন স্টেশনগুলিও সমালোচনা থেকে মুক্ত ছিল না । বিশেষ করে আমার এফএম এবং পাওয়ার এফএম এ একই গান বহুবার শোনানো হত । গানের বৈচিত্র বড়ই কম ।

আমি প্রথম কাজ পাই কলকাতার একটা অফিসে দুই মাসের কন্ট্রাক্টে ডেটা কনভারসন করার । সেখানে কাজের একঘেয়েমি দূর করার জন্য একটা এফ এম রেডিও লাগানো ছিল । কোনো এক রহস্যজনক কারণে রেডিওটিতে পাওয়ার এফএম ছাড়া আর কোন স্টেশন ধরত না । আর আমাদের বার বার একই গান শুনে মাথা খারাপ হবার যোগাড় ।

মাত্র কয়েকদিন আগে কলকাতায় শুরু হয়েছে পঞ্চম প্রাইভেট এফএম চ্যানেল বিগ এফএম । শোনা যাচ্ছে আরও কয়েকটি এফএম চ্যানেল কলকাতায় চালু হতে চলেছে । যাতে শুধুমাত্র গান ছাড়া অন্যান্য খবর ভিত্তিক অনুষ্ঠানও শোনা যাবে ।

কলকাতায় স্যাটেলাইট রেডিওর বিক্রিও বেশ কিছুদিন ধরে শুরু হয়েছে । কিন্তু স্যাটেলাইট রেডিও সফল হওয়া খুবই মুশকিল । কারণ এই রেডিওর মাসিক চার্জ আছে । আর এফএম চ্যানেলগুলোতেই যখন ফ্রীতে এত গান শোনা যাচ্ছে আর সস্তার এমপিথ্রীতে যখন বাজার ভরে গেছে তখন আবার মাসিক চাঁদা দিয়ে গান শোনার কোন মানে হয় না ।

Wednesday, May 17, 2006

আমার দ্বিতীয় অফিস

লোকের সাধারনত প্রথম অফিসের কথা বেশি করে মনে থাকে । আমার ক্ষেত্রে ব্যাপারটা একটু অন্যরকম । নানা কারনে আমার দ্বিতীয় অফিস আমার মনে দাগ কেটেছে ।

আমার প্রথম চাকরি একাশি দিনের মাথায় ছেড়ে দেবার পর বাড়িতে প্রায় নিষ্কর্মাই বসে ছিলাম । তারপর একদিন সন্ধ্যাবেলায় আমার বন্ধুর ফোন এল । কোন একটা অফিসে কনট্রাক্টে কাজ হতে পারে । পরদিন আকাডেমীর সামনে দাঁড়াতে বলল । তার কথা মত পরদিন আকাডেমী অফ ফাইন আর্টসের সামনে গিয়ে দাঁড়ালাম । তাকিয়ে দেখলাম চারিদিকে পোস্টারের ছড়াছড়ি । আকাডেমীর ডিরেক্টরকে বানর সম্বোধনে ভূষিত করে অনেক পোস্টার পড়েছে । একটু পরেই আমার সেই বন্ধু এল । তার সাথে বাসে চেপে সেই অফিসে এসে হাজির হলাম । একটি পুরনো দিনের ফ্ল্যাট বাড়ির পাঁচতলায় সেই অফিস । বিরাট দরজা জানলা, উঁচু ছাদ, পুরনো আমলের পাখা আর সুইচ । তার মধ্যেই কমপিউটার সাজিয়ে অফিস করা হয়েছে । কলকাতায় আধুনিক অফিসের সাথে কোনভাবেই খাপ খায় না । আমরা গ্রাফিক ডিজাইনার । আমি একটি সিডি বার করে ম্যানেজার মশাই এর হাতে দিলাম । দেখে বুঝলাম ম্যানেজার মশাই অফিসের সর্বেসর্বা । গোঁফদাড়ি কামানো বেশ পরিচ্ছন্ন মুখ । প্রায় চল্লিশ বছর বয়েস হবে । সিডিটা কমপিউটারে চালিয়ে আমার কাজ দেখলেন । অফিসে আরেকজন রয়েছে যাকে দেখে ম্যানেজার মশাইয়ের চ্যালা বলে মনে হল । যাকে আমরা সু-দা বলে ডাকব । তার সূত্রেই আমার বন্ধু আমাকে নিয়ে এসেছে । এরপর আমাদের জানানো হল এটা একটা কর্পোরেট কাজ । খুব তাড়াতাড়ি শেষ করতে হবে । এখন রিসার্চ ওয়ার্ক চলছে । কয়েকদিনের ভিতরেই জানানো হবে কবে থেকে কাজ আরম্ভ হবে । অফিসে আরো একজনকে দেখলাম ।বেশ নাটা চেহারা । গোল মুখ । গোল চোখ । ছোট ছোট করে ছাঁটা চুল । ইনি নাকি ক্রিয়েটিভ ডিরেক্টর । দেখে মনে হল বেশ কনফিউজড মানুষ । একটা সাধারন কথা বলতে গিয়ে তিনবার হোঁচট খাচ্ছেন । ইনি হলেন র-দা ।

যাই হোক প্রাথমিক কথাবার্তা সেরে বাড়ি ফিরে এলাম । কয়েকদিন বাদেই আমাদের ডাকা হল । এবং কাজও আরম্ভ হল ।

কাজে এসে পরিচয় হল আরো একজনের সাথে । ইনি হলেন তু-দা । দেখেশুনে বুঝলাম তু-দার অফিসে সেরকম কোনো কাজ নেই । কেবলি এদিক ওদিক ঘুরঘুর করছেন । ম্যানজার মশাই বললেন তু- হল আমাদের অফিসের ট্রাবলশুটার ।

দুপুর বেলা মাঝে মাঝে দেখতাম তু-দা সোফায় বসে ঘুমোচ্ছেন । আমাদের ধারনা ছিল একমাত্র সরকারি অফিসেই দুপুরবেলা নাক ডাকিয়ে ঘুমোনো যায় । এখানে এসে দেখলাম সেরকম ভাগ্য হলে প্রাইভেট চাকরিতেও এ সুখ পাওয়া যেতে পারে ।

ওই ফ্ল্যাটের ভিতরে দুটি অফিস ছিল । দুই ভায়ের দুই অফিস । আমরা বড় ভাইয়ের অফিসে কাজ করতাম । আর ছোট ভাইয়ের অফিসে ছিল প্রচুর সুন্দরী মেয়ের আনাগোনা । প্রায়ই দেখতাম নিত্যনতুন মেয়ে আসছে । তারা কতক্ষন কাজ করত আর কতক্ষন মোবাইলে আড্ডা দিত তা তারাই জানে । সবসময়েই দেখতাম আমদের ঘরের সামনে দিয়ে তারা মোবাইলে কথা বলতে বলতে পায়চারি করছে ।

অফিসের ভেতরের পরিবেশটা কেমন ছিল একটু বলি । অফিসের ভেতরে দেখলাম সবাই বাংলা ইংরাজি এবং হিন্দিতে কাঁচা কাঁচা খিস্তি ব্যবহার করছে । কেউ কাউকে যে সরাসরি দিচ্ছে এমন নয় । বেশিরভাগই আড়ালে অথবা উড়ো দেওয়া হচ্ছে ।

দুটো নতুন বাচ্চা ছেলের সামনে এরকম গালাগালির জোয়ার ম্যানেজার মশাইয়ের বোধহয় একটু কিন্তু কিন্তু লাগছিল । তিনি আমাদের বললেন - আমাদের এখানে কিন্তু একটু গালাগালি চলে তোমাদের কোনো অসুবিধে নেই তো । আমরা বললাম না নেই ।

তারপর কাজ এগোতে লাগল । র-দা নিয়মিত ভাবে আমদের কনফিউজড করতে লাগলেন । একই ডিজাইন আমরা হাজার বার করে বানাতে লাগলাম । প্রায়ই ডিজাইন দেখে র-দা বলতেন ভালই হয়েছে বাট আই থিঙ্ক সামথিং ইজ রং । এই সামথিং ইজ রং টা যে কি তা কোনোদিনই তিনি বলতে পারতেন না ।

অফিসে একটা ন্যাশনাল জিওগ্রাফিকের একশো বছরের সিডির সেট ছিল । একপেটি সিডি যা কখনও খোলা হয় নি । সেটা দেখে আমাদের ভীষন লোভ লাগল । যেভাবেই হোক সিডিগুলোকে রাইট করে নিতেই হবে । আমরা বললাম ন্যাশনাল জিওগ্রাফিকের সিডিগুলো আমাদের লাগবে । কারন ওগুলো থেকে অনেক ভালো ভালো ছবি পাওয়া যেতে পারে । এইবলে পেটিটা খোলা হল এবং ওগুলো আমরা আস্তে আস্তে রাইট করে নিলাম । তারপর আবার বললাম না এগুলো থেকে বিশেষ কিছু পাওয়া গেল না । ওগুলো তুলে রাখুন ।

অফিস থেকে আরও কিছু পিকচার সিডির সেট বেশ কিছু গান ইত্যাদিও সংগ্রহ করা গেল ।

এরপর একদিন মালিক এলেন অফিসে । বেশ লম্বা চওড়া মুসকো চেহারা । বিরাট শিল্পপতির ছেলে । এনার আসল ব্যবসা নাকি কম্পানি কেনাবেচা করা । প্রচুর টাকার মালিক অথচ অফিসে এসেছেন একটা ছেঁড়া জামা আর চটি পরে অথচ একটা দামী গাড়ি চেপে । আমাদের নামটাও একবার জিগেস করলেন না দেখে বেশ খারাপ লাগল । পরে অবশ্য বুঝেছিলাম । ভদ্রলোক ভালই ।

কাজ যতই এগোতে লাগল অফিসে গন্ডোগোল তত বাড়তে লাগল । এই সময় দুজন ভদ্রলোক র-দা২ আর পা-দা অফিসে এলেন কিছু ভিডিও এডিট করার কাজে । তাঁদের সাথেও আমাদের আড্ডা বেশ জমে উঠল । এদিকে কাজের ডেডলাইন পেরিয়ে প্রায় একমাস হয়ে গেছে । তাই আমদের প্রত্যেক রোববারেও অফিসে যেতে হত । অবশ্য রোববারে অফিসে খাওয়াটা পাওয়া যেত ।

অফিসে কাজ করতে করতে বোঝা গেল এই অফিসটি আসলে উঠে যেতে চলেছে । উঠে যাবার আগে এটাই শেষ প্রজেক্ট ।

মানে প্রদীপ নিভে যাবার আগে যেমন হঠাৎ দপ করে জ্বলে ওঠে সেরকম আর কি । আমাদের সামনেই অফিসের কমপিউটার টেবিল চেয়ার বিক্রির আলোচনা হতে লাগল । আমাদের কেরিয়ারের শুরুতেই আমরা দেখলাম কিভাবে একটা অফিস আস্তে আস্তে উঠে যায় ।

অফিসে সবার সাথে সবার গন্ডোগোল বাড়তে লাগল । অবশ্য আমাদের সাথে সবার সম্পর্ক ভালোই ছিল । খালি একদিন আমার বন্ধুর সাথে ক্রিয়েটিভ ডিরেক্টর র-দার ঝগড়া বেধে গেল । আমরা তো এখানে চাকরি করি না কয়েকদিনের কনট্রাক্টে এসেছি । সুতরাং আমাদের উপর টেম্পার নিলে আমারাই বা ছাড়বো কেন । তবে র-দা লোকটা এমনিতে মন্দ নয় । তখন কিছু ব্যক্তিগত কারনে মেজাজটা ওনার খিঁচড়ে ছিল ।

ম্যানেজার মশাই অফিসে না থাকলে সবার সাহস একটু বেড়ে যেত । একদিন দেখলাম সবাই মিলে ভরদুপুরে অফিসে বিয়ার খাচ্ছে । অফিসে একএক জনের জন্য এক এক রকম নিয়ম ছিল । কেউ কেউ যেমন র-দা এবং নতুন দুই এডিটর অফিসের পয়সাতেই ভালমন্দ সাঁটাতো । কিন্তু আমরা বাড়ি থেকে টিফিন নিয়ে যেতাম অথবা পিয়নকে টাকা দিয়ে আনিয়ে নিতাম ।

এই নিয়েও কিছু অশান্তি হয় । পরে নাকি মালিক আর ম্যানেজার মশাইয়ের মধ্যে আলোচনা করে ঠিক হয় যে র-দার টাকা থেকে নাকি তাঁর রোজকার চোব্যচোষ্যের টাকা বাদ দেওয়া হবে । তবে সেটা হয়েছিল কিনা সেটা ঠিক জানা নেই ।

আশা করি এতক্ষনে সবাই বুঝতে পেরেছেন কেন এই অফিসটা আমার মনে দাগ কেটেছে । কলকাতা শহরে এরকম অফিস আর আছে কিনা তা জানা নেই । যাই হোক বহু ঝামেলার পর নানা জোড়াতালি দিয়ে প্রজেক্টটা মোটামুটি শেষ করে আনা হয় । সু-দার সাহায্যে আমি আর একটা অফিসে ইনটারভিউ দিয়ে চাকরি পেয়ে যাই তাই প্রজেক্ট শেষ হবার প্রায় দিন পনেরো আগে আমি এই অফিস ছেড়ে দিই ।

আমার বন্ধু শেষ দিন অবধি ছিল । তার কাছে যা শুনেছি শেষ দিন অফিসে গিয়ে সে দেখে অতবড় অফিস পুরো খাঁ খাঁ করছে । সব কমপিউটার, আসবাব বিক্রি করে আছে । অফিসে বসবার মত কোন চেয়ারও অবশিষ্ট নেই । সবাই দাঁড়িয়ে আছে । আমার বন্ধুর আশা ছিল পড়ে থাকা কিছু ঝড়তি পড়তি মাল যেমন কিছু ভাল ছবি আর বই সে বাড়ি নিয়ে আসবে । কিন্তু সে কিছুই পেল না । সবই ম্যানেজার মশাই নিয়ে গেলেন ।

তারপর ফ্ল্যাটের মালিক এলেন । ফ্ল্যাটের চাবি তাঁর হাতে দিয়ে দেওয়া হল । এবং এই অফিসে বরাবরের মত তালা পড়ল। এইভাবে এই প্রজেক্ট শেষ হল ।