Sunday, March 16, 2008

হারবার্ট

হারবার্ট সিনেমাটির ভিসিডি কেনার মাত্র কয়েকদিন আগেই আমি জানতে পেরেছিলাম যে নবারুণ ভট্টাচার্যের রচিত এই উপন্যাসের উপর সুমন মুখোপাধ্যায় একটি ছবি তৈরি করেছেন এছাড়া ছবিটি সম্পর্কে আমার কাছে আর কোনো তথ্য ছিল না

ছবিটি দেখার পরে অনেকটাই স্তম্ভিত হয়ে গেলাম বাংলা ভাষায় এই রকমের ছবি আগে কখনও দেখেছি বলে মনে করতে পারলাম না থিয়েটার জগতের এক উল্লেখযোগ্য ব্যক্তিত্ব সুমন মুখোপাধ্যায় তাঁর পরিচালিত প্রথম ছবিতেই যে কৃতিত্বের স্বাক্ষর রাখলেন তা মনে রাখার মতো তবে ছবিটি বাংলা ভাষায় নির্মিত আরো অনেক সমান্তরাল ছবির মতো ছিল ফ্লপ

এর কারণ কি সুমন মুখোপাধ্যায়ের নাম চিত্রপরিচালক হিসাবে মানুষের কাছে অজানা ছিল বলে নাকি ছবির কেন্দ্রীয় চরিত্রে শুভাশিষ মুখোপাধ্যায় যাঁর স্টার ভ্যালু কম এখন তো বাংলা সমান্তরাল সিনেমাতেও বড় বড় স্টারদের নামনো হয় লোক টানার জন্য যেখানে আমাদের এখানের অনেক নামহীন অভিনেতাই তার থেকে ভাল অভিনয় করতে সক্ষম

কিছুদিন আগে ফেলিনির লা স্ট্রাডা ছবি সম্পর্কে লিখতে গিয়ে বলেছিলাম কিছু কিছু মানুষ থাকে যারা কেনই বা জন্মায় আর কেনই বা মরে যায় সে নিয়ে কারো মাথাব্যথা থাকে না হারবার্ট সিনেমার কেন্দ্রীয় চরিত্র হারবার্ট সরকার এই রকম একটি চরিত্র তার জীবনটা হতে পারত খুবই উঁচুদরের তার বাবা ছিল একজন সেলিব্রিটি চিত্রপরিচালক যার স্বভাবতই নায়িকাদের সঙ্গে ফস্টি নস্টি করার প্রবণতা ছিল কিন্তু শুটিং-এ গিয়ে সে বেঘোরে প্রাণ দিল এরকিছুদিন পরেই তার মা কাপড় মেলতে গিয়ে ছাদে কারেন্ট খেয়ে মারা গেল এর পর হারবার্ট জ্যাঠা জেঠিমার সংসারে লাঠি ঝ্যাঁটা খেয়ে বড় হতে লাগল শেষ পর্যন্ত সে হয়ে উঠল একজন প্রেত বিশেষজ্ঞ এরপর যুক্তিবাদী সমিতির হুমকি পেয়ে সে আত্মহত্যা করে

সিনেমাটিতে প্রচুর রূপক দৃশ্য ও ভাবনা আছে উত্তর কলকাতার সরু গলি আর উঁচুনিচু বাড়ির ল্যান্ডস্কেপ পুরনো বনেদী বাড়ির একতলার অন্ধকার ঘর সবই এক অদ্ভুত পরিবেশ রচনা করে জানলার ভিতর দিয়ে দেখা কাস্তে হাতুড়ি তারা, মৃত বাবা মার মুভি ক্যামেরার পিছনে দাঁড়িয়ে ছেলের কীর্তিকলাপ দেখা সবই কিছু ইঙ্গিত হিসাবে আমাদের চোখে ধরা পড়ে

ছবিটির গল্প শুধু অনুসরণ করলে ছবিটিকে বুঝে নিতে অসুবিধা হবে অনেক কথাই এখানে বলা হয়েছে পরোক্ষ ভাবে সত্তরের দশকের নকশাল আন্দোলন ছবিটির অন্যতম প্রেক্ষাপট সেই আন্দোলনের চেতনা যে একেবারে নিশ্চিহ্ন হয়ে যায় নি যেকোন মূহুর্তেই তা আবার ফেটে পড়তে পারে তা বোঝানো হয়েছে ছবিটির পিছনে গভীর রাজনৈতিক বক্তব্য আছে
ছবিটি কখনই একমাত্রিক বা লিনিয়ার নয় বরং বহুমাত্রিক সময়ের তিনটি আলাদা আলাদা স্তর কে পাশাপাশি ধরা হয়েছে এবং এই কাজটি পরিচালক অত্যন্ত দক্ষতার সাথে করেছেন আলো-ছায়া উঁচুনিচু সবই এখানে প্রতীক হারবার্টের কৈশোর এবং যৌবন, বর্তমান হারবার্ট এবং তার আত্মহত্যা করার পর আপাত রহস্য এবং পুলিশের তদন্ত সবই পাশাপাশি দেখানো হয়েছে

সুমন মুখোপাধ্যায় যে বহু নামকরা চিত্র পরিচালকের কাজ থেকে প্রভাবিত হয়েছেন তা সহজেই বোঝা যায় ফেলিনির প্রভাব
তাঁর কাজে ভালোই পড়েছে ছাদের উপরে কিশোর হারবার্টের হস্তমৈথুন করার দৃশ্যটি দেখে ফেলিনির অ্যমারকর্ড ছবিটির কথা মনে পড়ে যায় কিন্তু একথা স্বীকার করতেই হবে যে প্রভাবিত হয়েও তিনি চিত্রপরিচালক হিসাবে নিজের একটি জায়গা গঠন করতে সক্ষম হয়েছেন ছবিটিতে বেশ কিছু গালাগালি রয়েছে যা কিছু মানুষের অস্বস্তির কারণ হতে পারে কিন্তু আমার মনে হয়ে সিনেমাটিতে এগুলি ছাড়া চরিত্রগুলিকে পুরোপুরি বোঝানো যেত না

দৃশ্যনির্মান সম্পাদনা সংলাপ ক্যামেরা এবং পরিচালনা সবই অসাধারণ ব্যাকগ্রাউন্ড মিউজিকও মনে রাখার মত হারবার্ট এর চরিত্রে শুভাশিষ মুখোপাধ্যায় এছাড়া লিলি চক্রবর্তী, সব্যসাচী চক্রবর্তী, ব্রাত্য বসু, সবাই ভালো অভিনয় করেছেন তবে কিছু কিছু জায়গায় অভিনয় একটু লাউড মনে হয় পরিচালক ইচ্ছাকৃত ভাবেই এটা করেছেন অথবা থিয়েটার অভিনয়ের লাউডনেস এই ছবিতেও একটু এসে ঢুকেছে

ছবিটি দেখার পর নবারুণ ভট্টাচার্যের মূল উপন্যাসটি পড়ার ইচ্ছা খুব বেড়ে গেল মূল উপন্যাসটি সাহিত্য একাদেমি পুরস্কার প্রাপ্ত বিজন ভট্টাচার্য এবং মহাশ্বেতা দেবীর সুযোগ্য সন্তান নবারুন নিজেও কতটা প্রতিভাশালী লেখক তার বোঝার জন্য বইটি পড়তেই হবে

যাঁরা একটু অন্য ধরণের সিনেমা দেখতে ভালবাসেন তাঁদের দেখতেই হবে এই ছবি ভারতে মোজার বায়ার কম্পানি এই ছবির ভিসিডি বের করেছে দুটি সিডির সিনেমার দাম মাত্র তিরিশ টাকা


Monday, February 11, 2008

বাংলা উইকিপিডিয়া -- পশ্চিমবঙ্গের মানুষদের বলছি

আমরা কথায় কথায় বলি যে আমরা তথ্যপ্রযুক্তির যুগে বসবাস করছি । আর পশ্চিমবঙ্গ যে এই তথ্যপ্রযুক্তিতে ক্রমাগত এগিয়ে চলছে তাও আমরা বুঝতে এবং দেখতে পারছি বিভিন্ন মিডিয়াতে । এবং আমাদের বাস্তব অভিজ্ঞতাতেও ।

কিন্তু এই তথ্যপ্রযুক্তির সুবিধাকে সমস্ত স্তরের মানুষদের কাছে পৌছে দিতে হবে । আর সেটা করা সম্ভব কম্পিউটারে মাতৃভাষা ব্যবহারের মাধ্যমে । গ্রামে গ্রামে শুধু কম্পিউটার আর ইন্টারনেট পৌছে দিলেই হবে না । ইন্টারনেটে যদি বাংলা ভাষায় পড়ার মত উপযুক্ত বিষয় না থাকে তাহলে কখনই আমাদের তথ্যপ্রযুক্তিকে সর্বস্তরে পৌছে দেওয়ার স্বপ্ন সফল হবে না । তাই বাংলার সাধারন মানুষের হাতে পৌছে দিতে হবে জগতের সব তথ্য । আমাদেরই মাতৃভাষায় - বাংলা ভাষায় ।

ইতিহাস, ভূগোল, বিজ্ঞান, দর্শনশাস্ত্র, ভাষাবিজ্ঞান, গণিত, প্রভৃতি বিষয়ের সঙ্কলন হল বিশ্বকোষ । অর্থাৎ বিশ্বকোষ এমন একটি জিনিস যাতে সমস্ত কিছুর উপরেই তথ্য পাওয়া যেতে পারে । কিন্তু বাংলায় লেখা আধুনিক এবং সম্পূর্ণ বিশ্বকোষের অভাব রয়েছে । আর তার দামও বিশাল । অধিকাংশ মানুষের পক্ষেই তা কেনা সম্ভব নয় । আর এই বাংলা বিশ্বকোষের বদলে পড়া যেতে পারে ইংরাজি বিশ্বকোষ যেমন এনকার্টা, বা ব্রিটানিকা । এখন যাঁদের ইংরাজি জ্ঞান কম তাঁদের পক্ষে এগুলি পড়া সম্ভব নয় । আর ইংল্যান্ড বা আমেরিকা থেকে প্রকাশিত হওয়ার জন্য এগুলিতে ভারতীয় বা বাংলার বিষয় কম থাকে । বাংলা সাহিত্যের ইতিহাস সম্পর্কে যদি আপনার আগ্রহ থাকে তাহলে ব্রিটানিকা বা এনকার্টা থেকে আপনি বেশি তথ্য পাবেন না ।
আর ভারত বা বাংলার বিষয়গুলি এই বিদেশি বিশ্বকোষগুলিতে লেখা হয় বিদেশী দৃষ্টিকোন থেকে সেগুলি পড়ে আমাদের যদি নিজেদের সংস্কৃতি, সাহিত্য, সঙ্গীত, ইতিহাস সম্পর্কে জানতে হয় তার থেকে দুঃখজনক আর কিছু নেই ।

অনেকেই হয়ত অবগত আছেন ইংরাজি উইকিপিডিয়া সম্পর্কে । এটি পৃথিবীর সবথেকে বড় উইকিপিডিয়া । কিন্তু অনেকে হয়ত জানেন না যে উইকিপিডিয়ার একটি বাংলা সংস্করণও আছে । ইন্টারনেটে বাংলা বিশ্বকোষ বাংলা উইকিপিডিয়া (bn.wikipedia.org) লেখার কাজ চলেছে প্রায় বছর দুই ধরে । এর মধ্যেই সতেরো হাজারেরও বেশি নিবন্ধ তৈরি করা হয়েছে । কিন্তু এই নিবন্ধের অনেকগুলিই রয়েছে প্রাথমিক অবস্থায় । তাই এই নিবন্ধগুলিকে আরো এগিয়ে নিয়ে যাবার জন্য দরকার স্বেচ্ছাসেবকের । এরমধ্যেই বাংলাদেশ থেকে বহু মানুষ এগিয়ে এসেছেন । কিন্তু খুবই দুঃখের বিষয় এই যে পশ্চিমবঙ্গ থেকে স্বেচ্ছাসেবকের সংখ্যা নামমাত্র । আমারা পশ্চিমবঙ্গের মানুষের আমাদের রাজ্যে তথ্যপ্রযুক্তির উন্নতি নিয়ে খুবই গর্ব করি বটে কিন্তু বাংলা উইকিপিডিয়ার ব্যাপারে আমরা খুবই পিছিয়ে আছি ।

বাংলাদেশের স্বেচ্ছাসেবকদের দ্বারা পশ্চিমবঙ্গের সমস্ত বিষয় নিয়ে লেখা সম্ভব নয় । বলুন তো কলেজ স্ট্রিট কফি হাউসের উপর নিবন্ধ লিখতে গেলে তো এরকম মানুষকেই প্রয়োজন যাঁর এখানে নিয়মিত যাতায়াত আছে । অথবা কলকাতা বইমেলা নিয়ে লিখতে গেল এরকম মানুষ প্রয়োজন যিনি এখানে ঘুরে বেড়িয়েছেন । আর বাংলা উইকিপিডিয়াতে লিখতে গেলে কোন বিশেষজ্ঞ হবার প্রয়োজন নেই । আপনার শিক্ষাগত যোগ্যতা বা বয়েস কোনটাই বিচারযোগ্য নয় । শুধু ইচ্ছেটাই এখানে বড় কথা । সমস্ত কাজের মধ্যেও আপনি যদি রোজ মাত্র একলাইন করেও বাংলা উইকিপিডিয়ায় লেখেন তাহলেও বছরে ৩৬৫ লাইন লেখা হয় । আর অনেকে যদি অল্প অল্প লেখেন তাহলে এই বিন্দু বিন্দু করেই আমরা সবাই মালিক হতে পারি এক বিরাট বাংলা বিশ্বকোষের । আর যদি আপনার মনে হয় যে কোন বিষয়েই জ্ঞান নেই (যেটা আসলে ভুল) তা হলেও আপনি বাংলা উইকিপিডিয়ায় আপনার অবদান রাখতে পারেন ইংরাজি উইকিপিডিয়া থেকে নিবন্ধ অনুবাদ করে বা বানান এবং ব্যকরনগত সমস্যা দূর করে ।

বাংলাদেশের স্বেচ্ছাসেবকেরা যদি বাংলা উইকিপিডিয়ার উন্নতিতে এগিয়ে আসতে পারেন তাহলে আমরাই বা কেন পিছিয়ে থাকব? তাই আসুন আমরা গঠনমূলক এই প্রজেক্টে অংশগ্রহন করে আমাদের ভবিষ্যৎ সমাজের হাতে তুলে দিই বাংলা ভাষায় এক চমৎকার বিশ্বকোষ ।

Saturday, February 09, 2008

ফেডেরিকো ফেলিনির লা স্ট্রাডা

সমাজের কিছু প্রান্তিক মানুষ থাকে যারা কেনই বা জন্মায় আর কেনই বা মরে যায় তা নিয়ে কারোর কোনো মাথাব্যথা থাকে না । তাদের সুখ দুঃখ চিন্তা ভাবনা চাপা পড়ে যায় সময়ের সাথে সাথে । এরকম দুজন প্রান্তিক মানুষের প্রেমকাহিনী নিয়ে ফেলিনির লা স্ট্রাডা ।

ফেলিনির আগের যে সমস্ত ছবি দেখেছিলাম যেমন আই ভিতেলোনি (I vitelloni ), এইট অ্যান্ড হাফ, অ্যমারকর্ড সেগুলি বেশিরভাগই ছিল আত্মজীবনী মূলক । সেদিক থেকে লা স্ট্রাডা বেশ আলাদা ।

ইটালির উপকূলের এক গরীব পরিবারের মেয়ে জেলসোমিনা । তাকে তার মা অল্প কিছু টাকার বিনিময়ে বেচে দেয় সার্কাসে খেলা দেখানো জ্যামপানোর কাছে । জ্যামপানো খুবই কড়া ধাঁচের বদরাগী লোক । সে একটা মোটরবাইক কাম ভ্যান নিয়ে বিভিন্ন জায়গায় খেলা দেখিয়ে বেড়ায় । জ্যামপানো জেলসোমিনাকে অল্প ট্রেনিং দিয়ে তার খেলা দেখানোর সহকারী হিসাবে লাগায় । জেলসোমিনার আচার আচরন ছিল ঠিক একটা ক্লাউনের মত । ছোট ছোট করে ছাঁটা চুলে তাকে মেয়ে বলেই মনে হত না । আর সিনেমার নায়িকাসুলভ কোন গুনই জেলসোমিনার ছিল না । জ্যামপানোর হাজার দোষ সত্ত্বেও জেলসোমিনার তাকে ভাল লাগতে থাকে ।

জ্যামপানোর আচার আচরন এবং নারীসঙ্গে বিরক্ত হয়ে সে একবার পালিয়ে যায় । কিন্তু জ্যামপানো আবার তাকে ধরে আনে । এর মধ্যেই তাদের সাথে দেখা হয় সার্কাসে ব্যালান্সের খেলা দেখানো 'দ্য ফুল' এর সাথে । দ্য ফুলের সাথে জ্যামপানোর আগে থেকেই শত্রুতা ছিল । একবার ছুরি নিয়ে দ্য ফুলকে মারতে গিয়ে জ্যামপানো পুলিশের হাতে ধরা পড়ে । সেই সময় জেলসোমিনা খুব সহজেই চলে যেতে পারত । কিন্তু সে যায় না । জ্যামপানো ছাড়া পেতেই সে আবার ফিরে যায় ।

এরপর একসময় রাস্তায় আবার জ্যামপানো আর দ্য ফুল মুখোমুখি হয় । দুজনের মারামারিতে দ্য ফুল আহত হয় আর মারা যায় । এই ঘটনায় জেলসোমিনা খুবই আঘাত পায় আর মানসিকভাবে বিধ্বস্ত হয়ে পড়ে । তাকে এই অবস্থায় দেখে জ্যামপানো নিজের ভুল বুঝতে পারে আর জেলসোমিনাকে একজায়গায় রেখে চলে যায় ।
বেশ কিছু বছর পরে জ্যামপানো জানতে পারে যে এর কিছুদিন পরেই জেলসোমিনা মারা গিয়েছিল । সিনেমার শেষ দৃশ্যে দেখা যায় জ্যামপানোকে রাতের অন্ধকার সমুদ্রের ধারে কাঁদতে ।

অসাধারন এই সিনেমার মূল আকর্ষন হচ্ছে জ্যামপানোর ভূমিকায় অ্যান্টনি কুইন আর জেলসোমিনার ভূমিকায় জিউলিয়েতা ম্যাসিনার অভিনয় । সম্ভবত অ্যান্টনি কুইন তাঁর জীবনের সেরা অভিনয় করেছেন এই ছবিতে । আর জিউলিয়েতা ম্যাসিনার অভিনয় সম্পর্কে বেশি কিছু না বলাই ভালো । মুখের এক্সপ্রেসন বদলাতে তাঁর জুড়ি নেই । চরিত্রের একেবার ভিতরে ঢুকে কিভাবে তাকে জীবন্ত করে তুলতে হয় তার তুলনা বোধহয় আর পাওয়া যাবে না । চরিত্রটির সরলতা, দুঃখ, আনন্দ, কষ্ট সবই তিনি ফুটিয়ে তুলেছেন অনবদ্য ভাবে ।
এই প্রসঙ্গে উল্লেখ্য যে জিউলিয়েতা ম্যাসিনা হলেন ফেলিনির স্ত্রী । তাঁরা এর আগে ও পরে বহু ছবিতে একসাথে কাজ করেছেন । ছবিটির নেপথ্যসঙ্গীতও মনে রাখার মত ।
১৯৫৬ সালে সেরা বিদেশী ছবির জন্য এটি অস্কার পুরষ্কার পেয়েছিল ।

Saturday, January 26, 2008

গুগল বই সমাচার

বেশ কিছুদিন ধরেই গুগল বই এর সাইটটি (books.google.com) আমার নজরে এসেছিল । প্রথমে একটু নিরাশই হয়েছিলাম কেননা এতে কোনো বইয়ের পুরোটা দেখা যাচ্ছিল না কেবল অংশবিশেষ দেখা যাচ্ছিল । তারপর একটু ভাল করে নজর করে দেখলাম যে ফুল ভিউ লিংকে গেলে যে বইগুলি দেখা যায় তার বেশিরভাগই ফ্রিতে দেখা আর ডাউনলোড করা যাচ্ছে পিডিএফ ফরম্যাটে ।

একটু সার্চ করতেই খুঁজে পেলাম আদ্যিকালের দুষ্প্রাপ্য সমস্ত বইয়ের স্ক্যান করা কপি । আমার প্রিয় বিষয় ইতিহাস । তাই ভারত ও বাংলার ইতিহাসের বই প্রথমেই খুঁজে দেখলাম । পেলাম দারুণ দারুন সমস্ত বই । বেশিরভাগ বই ঊনবিংশ শতাব্দীতে ভারতে আগত ব্রিটিশ সরকারী কর্মচারী বা মিশনারীদের লেখা । সেসময়ের ভারতের নানা রকমের ভ্রমনের কাহিনী, সিপাহী বিদ্রোহের রোমাঞ্চকর বর্ণনা, সতীদাহের চাক্ষুষ বর্ণনা বাদ যায় নি কিছুই । খুব আকর্ষনীয় বিষয়ের মধ্যে রয়েছে স্লিম্যান সাহেবের লেখা ভারতীয় ঠগী আর ফাঁসুড়েদের উপর বই । আর একজন মহিলার লেখা বইতে রয়েছে কিভাবে ১৮০২ সালে তিনি জলপথে কলকাতা থেকে মুর্শিদাবাদ গিয়ে মীরজাফরের স্ত্রী মুন্নি বেগমের সঙ্গে দেখা করেছিলেন তার বর্ণনা । খুঁজতে খুঁজতে পেলাম একেবারে প্রথম যুগের বাংলা থেকে ইংরাজি ডিকশনারি যা ছাপা হয়েছিল শ্রীরামপুরে ।

গুগল বইয়ের একটা ভাল দিক হচ্ছে এখানে আসল বই থেকে স্ক্যান করা পাতাগুলি দেখা যায় । তবে স্ক্যান করা হলেও বই গুলি সার্চযোগ্য । কারন স্ক্যান করা বইয়ের পাতার ছবিগুলির সাথে ওসিআর করা টেক্সটও রাখা আছে । কিন্তু স্ক্যানের কোয়ালিটি নিয়ে অনেক সময়েই প্রশ্ন উঠতে পারে । কিছু কিছু বই খুব বাজে ভাবে স্ক্যান করা হয়েছে । পাতা কেটে বেরিয়ে গেছে এরকম ব্যাপারও আমার চোখে এসেছে ।

পুরনো বই খুঁজতে খুঁজতে একটা ব্যাপার আমার নজরে এসেছিল সেটা হচ্ছে ফ্রি ডাউনলোডের জন্য যে বইগুলি দেওয়া হচ্ছে সেগুলি সবই ১৮৪০-৫০ এর সময়কার বা তার আগের কিন্তু এই সময়ের পরের বইগুলি যেগুলির উপরে কপিরাইট নেই যেমন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের লেখা বই সেগুলি কিন্তু ফ্রিতে ডাউনলোডের জন্য পাওয়া যাচ্ছে না ।
আমেরিকার কপিরাইট আইন ঘেঁটে দেখলুম যে ১৯২৩ সালের আগে প্রকাশিত সব বই পাবলিক ডোমেনে চলে গেছে মানে তাদের উপরে আর কপিরাইট নেই । কিন্তু বই তো ১৮৪০-৫০এর পরে প্রকাশিত হলে ফ্রিতে ডাউনলোড দিচ্ছে না । ব্যাপারটা কি ?

নেটে একটু খোঁজখবর করে দেখতে পেলাম যে ব্যবহারকারী যদি আমেরিকার বাইরে থেকে গুগল বই ব্যবহার করে তবে সে ১৮৬৫ সালের পরের কোন বই ফ্রী তে ডাউনলোড করতে পারবে না । কিন্তু সে যদি আমেরিকার ভিতর থেকে গুগল বই ব্যবহার করে তাহলে ১৯২৩ সাল পর্যন্ত সমস্ত বই ফ্রিতে ডাউনলোড করতে পারবে । একটা প্রক্সি সার্ভার ব্যবহার করে দেখলাম ঠিক তাই । সাধারণ ভাবে রবীন্দ্রনাথের লেখা কোন বই ফ্রিতে ডাউনলোড করতে দিচ্ছে না কিন্তু প্রক্সি সার্ভার ব্যবহার করে গুগল বই খুললে তখন রবীন্দ্রনাথের ১৯২৩ সাল পর্যন্ত প্রকাশিত সব বই ডাউনলোড করা যাচ্ছে । বিভিন্ন দেশের কপিরাইট আইন বিভিন্ন রকম হওয়ার জন্য গুগলের পক্ষে সত্যিই ট্র্যাক রাখা কঠিন কোন বইয়ের কোন দেশে কপিরাইট আছে আর কোন দেশে নেই । যেমন ভারতের কপিরাইট আইনে লেখকের মারা যাওয়ার পর ৬০ বছর পর্যন্ত কপিরাইট বলবৎ থাকে । আবার কোন কোন দেশে এই আইন ৭০ থেকে ১০০ বছর পর্যন্তও হয়ে থাকে । তাই যে বই আমেরিকায় পাবলিক ডোমেনে চলে গেছে সেই বই হয়তো ভারতে কপিরাইটের আওতায় আছে ।

তাই গুগলের বিশেষ কিছু করার ছিল না কোন লেখক কবে মারা গেছে আর কোন দেশে সেই অনুযায়ী কপিরাইট আছে কি নেই তার ট্র্যাক রেখে সেই অনুযায়ী সেই দেশের আই পি দেখে ডাউনলোডের অনুমতি দিতে গেলে তারা পাগল হয়ে যাবে । তাই আমেরিকার বাইরের সবাইকে ১৮৬৫ সাল অবধি প্রকাশিত বই নিয়েই সন্তুষ্ট থাকতে হবে ।

আমি প্রক্সি সার্ভার দিয়ে বই ডাউনলোড করার চেষ্টা করে দেখলাম ডাউনলোড হচ্ছে কিন্তু স্পিড স্লো । আর ডাউনলোড কোন ভাবে আটকে গেলে তাকে আবার প্রথম থেকে চালু করতে হচ্ছে । যেটা সাধারণভাবে ডাউনলোড করতে গেলে করতে হয় না ।

গুগল সত্যিই আমাদের সামনে এক বিরাট সুযোগ এনে দিয়েছে দুষ্প্রাপ্য বইগুলি দেখার ও পড়ার । কিন্তু এই কপিরাইটের কচকচিতে তার অনেকটাই বানচাল হতে চলেছে । তাই কেউ যদি গুগল বই থেকে অন্তত ১৯২৩ সাল পর্যন্ত বইগুলি আমেরিকার বাইরে ডাউনলোডের সহজ পদ্ধতি জানান তাহলে খুবই কৃতজ্ঞ থাকব ।

Friday, December 28, 2007

বাজে গল্প

আজ থেকে বেশ কিছু বছর আগে এক ভদ্রলোক ব্যবসার কারনে চিনে গিয়েছিলেন । সেখানে বেশ কিছুদিন থাকার ফলে তিনি চিনা ভাষা ভালোই বলতে ও বুঝতে পারতেন কিন্তু পড়তে বা লিখতে পারতেন না ।

চিনে সেই ভদ্রলোক এক মাঝারি শহরে একটা বাড়ির একতলা ভাড়া নিয়ে কিছুদিন ছিলেন । সেই বাড়ির পাশের বাড়িতে এক চিনা তরুণী তার বাবা মার সঙ্গে ভাড়া থাকত ।

পাশাপাশি থাকতে থাকতে সেই সুন্দরী তরুণীর সঙ্গে ভদ্রলোকের বেশ ভালোই ভাব জমে উঠল । ভদ্রলোক ভাবতে লাগলেন এখানেই এই মেয়েটিকে বিয়ে করে থেকে গেলে ভালোই হয় ।

ক্রমে দিন কাটতে লাগল । এরপর ভদ্রলোক একবার অল্প কিছুদিনের জন্য দেশে ফিরলেন । তারপর যখন আবার চিনে ফিরে গেলেন তখন দেখলেন যে সেই তরুণী তার বাবা মার সঙ্গে ঘর ছেড়ে দিয়ে অন্য কোথাও চলে গেছে । ভদ্রলোক ব্যস্ত হয়ে মেয়েটির অনেক খোঁজ খবর করলেন । কিন্তু কেউই তাদের কোন খবর বলতে পারল না ।

কিছুদিন বাদে ভদ্রলোকের কাছে একটা চিঠি এসে পৌছাল । আগেই বলেছি যে ভদ্রলোক চিনা ভাষা কিছুই পড়তে পারতেন না । কিন্তু তিনি বুঝতে পারলেন যে এই চিঠিটা সেই মেয়েটাই তাকে লিখেছে । কারণ তিনি এই রকমের খাম আর কাগজ মেয়েটির ঘরে দেখেছিলেন আর মেয়েটি যে সেন্ট ব্যবহার করত তার গন্ধও চিঠিটা থেকে পাওয়া যাচ্ছিল । ভদ্রলোক বেশ আশান্বিত হয়ে উঠলেন । যাক এবার খবর পাওয়া যাবে খালি চিঠিটা কাউকে দিয়ে পড়াতে হবে ।

ভদ্রলোক এবার তাঁর বাড়িওলার কাছে গেলেন । বাড়িওয়ালা হলেন এক মধ্যবয়স্ক মোটা আর রাগী ভদ্রমহিলা । ভদ্রলোক চিঠিটা তাঁর হাতে দিয়ে খুব বিনীত ভাবে তাঁকে অনুরোধ করলেন চিঠিটা পড়ে দেবার জন্য ।

ভদ্রমহিলা চিঠিটা হাতে নিয়ে পড়তে আরম্ভ করলেন । কিন্তু একি পড়বার আগেই তাঁর মুখ কুঁচকে উঠল । তিনি হঠাৎ বিরাট চিৎকার আরম্ভ করলেন । যার বাংলা করলে হয় বজ্জাত ছোকরা তুই আমার কাছে এই চিঠি পড়াতে এনেছিস । বেরো শিগ্গির আমার বাড়ি থেকে ।

ভদ্রলোক কোনভাবেই বুঝিয়ে তাঁকে শান্ত করতে পারলেন না । ভদ্রমহিলা কোনভাবেই শান্ত হলেন না । কয়েক ঘন্টার মধ্যেই তিনি তাঁকে বাড়ি থেকে বার করে দিলেন ।

ভদ্রলোককে মালপত্র নিয়ে অগত্যা একটা হোস্টেলে আশ্রয় নিতে হল ।

হোস্টেলে থিতু হয়ে তিনি একজন বোর্ডারকে চিঠিটা দেখাতেই সেও ভদ্রলোকের উপর ক্ষেপে উঠল । বলা যায় কেবল মারতে বাকি রাখল । ভদ্রলোক কিছুই বুঝতে পারলেন না কি হচ্ছে ।

দিন কয়েক বাদে ভদ্রলোক তাঁর একজন খদ্দের কে চিঠিটা দেখালেন । এবারেও একই কান্ড । সেই খদ্দের তো চটে উঠলই তক্ষুনি ভদ্রলোকের সাথে সমস্ত ব্যবসায়িক লেনদেন বন্ধ করে দিল । আর তার অফিস থেকে ভদ্রলোককে চরম অপমান করে বের করে দিল । আরো হুমকি দিল যে এবার থেকে যদি তাকে ত্রিসীমানায় দেখা যায় তবে পুলিশে দেবে ।

বার বার তিনবার নাস্তানাবুদ হয়ে ভদ্রলোক ঠিক করলেন না এই চিঠি আর কাউকে দেখানো যাবে না । চিন দেশের আইন খুব কড়া কে জানে এবার হয়ত জেলে পুরে ফাঁসিই দিয়ে দেবে ।

তাই ভদ্রলোক ঠিক করলেন যে তিনি দেশে ফিরে আসবেন মেয়েটির সঙ্গে দেখা করার আশা ছেড়ে দিয়ে । আর মেয়েটি নিশ্চই ভালো কথা কিছু লেখেনি চিঠিতে যা দেখে সবাই চটে উঠছে ।

ভদ্রলোক চিন থেকে জাহাজ পথে দেশে ফিরতে লাগলেন । জাহাজে তিনি খুবই বিমর্ষ মুখে ঘুরে বেড়াতে লাগলেন । তাই দেখে এক ফুর্তিবাজ আমেরিকান ছোকরা তাকে জিজ্ঞাসা করল কিহে তোমার ব্যাপারটা কি যখনই দেখি তখনই মুখ হাঁড়ি ।

ভদ্রলোক তখন তাকে ব্যাপারটা খুলে বললেন । ছোকরাটি বলল দেখি তো তোমার চিঠিটা । আমি চিনেতেই বড় হয়েছি । তাই আমি ভালো মতই চিনা ভাষা পড়তে পারি । ভদ্রলোক বললেন দেখ যেই এই চিঠি পড়েছে সেই আমার উপর ক্ষেপে উঠে মারতে বাকি রেখেছে । তুমি হয়তো এই চিঠি পড়ার পর আমাকে হয়তো জাহাজ থেকে লাথি মেরে ফেলে দেবে ।

ছোকরাটি হেসে বলল – না না তোমার ভয় পাবার কিছু নেই । চিঠিতে যতই খারাপ কথা লেখা থাক না কেন আমি তোমার উপর রাগ করবো না । তুমি তো আর এই চিঠিটা লেখোনি ।

ভদ্রলোক তখন আশ্বস্ত হয়ে চিঠিটা পকেট থেকে বের করে ছেলেটির হাতে দিলেন ।

ছেলেটি চিঠিটা নিয়ে ডেকের রেলিঙের উপর ঝুঁকে পড়তে যাবে এমন সময় একটা দমকা হাওয়া এসে চিঠিটাকে ছেলেটির হাত থেকে উড়িয়ে নিয়ে গিয়ে মাঝসমুদ্রে ফেলল ।

ফলে ভদ্রলোকের আর কোনদিনই জানা হয়নি যে চিঠিটাতে কি লেখা ছিল ।


(গল্পটা একজনের মুখে শোনা । আমি একটু রঙ চড়িয়ে বললাম মাত্র)