Tuesday, November 21, 2006

আমার অফিস যাওয়ার রাস্তা

দিন চলে যায় দিনের মত । আমি রোজ লোকাল ট্রেনে ডেলি প্যাসেঞ্জারি করি । রোজ সকালে ফাঁকা ট্রেন ছেড়ে দিয়ে ভিড় ট্রেন ধরি । ব্যাগ কাঁধে নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকি একা, আজও ট্রেনে আমার কোন বন্ধু হল না ।

দমদম স্টেশনে ভিড় একটু ফাঁকা হলে গেটের কাছে এসে দাঁড়াই । বিধাননগর আসতেই নেমে পড়ি, বলা ভালো পিছনের ভিড় আমাকে ঠেলে নামিয়ে দেয় ।

রোজই চোখ তুলে বিধাননগর স্টেশনের গায়ে তৈরি হওয়া বিরাট ফ্ল্যাটবাড়িটার দিকে একবার চেয়ে দেখি । কি বিরাট ! স্টেশনের একদিক পুরো ঢেকে গেছে । কিছু লোক লাইনের উপর দিয়েই চলতে আরম্ভ করে আর রেল লাইনের পাশে গিয়ে হিসি করতে শুরু করে । এটাই কলকাতা । এখানে এসবে কেউ বিরক্ত বা উত্তেজিত হয় না । লাইনের উপর দিয়ে চলতে গিয়ে বিধাননগর স্টেশনে কত লোক মরেছে । কিন্তু তবুও লাইনের উপর দিয়ে পারাপারের বিরাম নেই ।

স্টেশন থেকে বেরিয়ে হেঁটেই অফিস যাই । চারিদিকে ধোঁয়া ধুলো আর ময়লা । বিবর্ণ সমস্ত বাস, ট্যাক্সি আর অটো ধোঁয়া ছাড়তে ছাড়তে চলেছে । লোকজন দৌড়াচ্ছে তাতে চড়বে বলে । ফুটপাত ভাঙাচোরা, তার আবার বেশির ভাগ অংশ দখল করে আছে দোকানদাররা । নোঙরার মধ্যেই চলছে রান্না বান্না খাওয়াদাওয়া । চারিদিকে মাছি উড়ছে । গাছের পাতাগুলোও ধুলো পড়া । চায়ের দোকানে ভিড়, হাতে খবরের কাগজ। এরা কি কোনদিন অফিসে যায় না ? গামছা পরা লোক খালি গায়ে, হাতে মোবাইল, ছোট ট্রাকে করে এসেছে মুরগী ভর্তি কন্টেনার, রাস্তার উপর পড়ে আছে একটা মরা মুরগী।

বাচ্চারা মা অথবা কাজের মেয়ের হাত ধরে স্কুল থেকে বাড়ির দিকে চলেছে আর আমি চলেছি অফিসে । মাল আনার ভ্যানরিকশাগুলো রাস্তার উপরেই রাখা । ফুটপাতের উপর কেরোসিন বিক্রি হচ্ছে । কোথাও আবার বেদী করে মন্দির । ধর্মবিশ্বাসী লোকের অভাব নেই এখানে । কোথাও আবার দলবদ্ধভাবে তাস খেলা চলেছে । কেউ বা দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে রাস্তার পাশের বোর্ডে টাঙানো গণশক্তি পড়ছে । রাস্তার পাশের দোকানের পিসিও বুথে মিকি মাউসের ছবি । কোথাও বা বসে আছে একটি সুন্দরী কিন্তু হতাশ এক তরুণী । সুন্দর সকাল সন্ধ্যা গুলো বোধহয় তার দোকানে বসেই কাটে । রাস্তার ধারের সাইনবোর্ডে মাইকেল মধূসুদনের ছবি । ফুটপাতে ঘুমন্ত কুকুর । এই নিয়েই আমার অফিসে যাবার রাস্তা

অবশেষে বড় রাস্তা থেকে আমি বাঁক নিই ডানদিকে এক সরু গলির ভিতরে । বড় রাস্তার বিরাট আওয়াজ কোলাহল অনেক কমে আসে । ডান দিকে বাঁদিকে গেরস্ত বাড়ি । বাঁদিকে একটা ঘরে তালাবন্দী কোন দেবতা । অনেকেই দেখি দরজা ছুঁয়ে প্রণাম করে যায় । আরো খানিকটা যাবার পর অবশেষে আমি অফিসের দরজায় এসে হাজির হই । এটা কোন অফিস পাড়া নয় । তবু এখানেই আমার অফিস । এখানেই নয় ঘন্টা কাটানোর পরে আমাকে আবার ফিরতে হবে সেই একই রাস্তা দিয়ে । তবে সেটা আলাদা এক গল্প ।

2 comments:

Anonymous said...

বাঃ ! দারুন লেখনি, সহজ, সরল, স্বাভাবিক, কিন্তু চিত্তাকর্ষক ৷

litonhasan said...

ধন্যবাদ,লেখাটা পড়ে ভালো লাগলো | আমি আপনাকে কোন প্রকার অফার করছি না। আমার মানে হয় এই ছোট তথ্যটি আপনার উপকারে আসতে পারে অ্যাপার্টমেন্ট ভাড়া।